গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ‘খাল খনন ও সংস্কার’ প্রকল্প কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিক দিয়ে খাল খননের কথা থাকলেও কোনো প্রকার শ্রমিকের উপস্থিতি ছাড়াই এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) নাইট গার্ড জাহিদ পুরো প্রকল্পের টাকা লেনদেন ও তদারকি করছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ৩২২ টাকা ব্যয়ে মোট ১৩টি খাল খনন অথবা পুনঃখনন ও সংস্কারের অনুমোদন দেয় দেওয়া হয়। যার মধ্যে দুটি পড়েছে সাঘাটা উপজেলায়। একটি পদুমশহর ইউনিয়নের দাতিয়া খাল। এই প্রকল্পের ব্যয় ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৭ টাকা। অপরটি কামালের পাড়া ইউনিয়নের কৈচড়া খালের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ২১ হাজার ৬৬৩ টাকা।
সরেজমিনে সাঘাটা উপজেলার পদুমশহর ইউনিয়নের ‘দাতিয়া খাল’ খনন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দুটি এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে পুরোদমে খনন কাজ চলছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটিতে ৫৯ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও মাঠে মাত্র তিনজন শ্রমিককে দেখা গেছে। মাত্র পাঁচ দিনে ভেকু দিয়ে প্রকল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
ভেকু মেশিনের চালক নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা চুক্তিতে গত পাঁচ দিন ধরে তারা কাজ করছেন এবং এই বিলের টাকা দিচ্ছেন জাহিদ নামে এক ব্যক্তি। দুটি ভেকু দিয়ে পাঁচ দিনে ২ লাখ টাকা খরচে প্রায় ৩০০ মিটার খনন কাজ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খাল খনন প্রকল্পের টাকা লেনদেন ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা জাহিদ নামের ওই যুবক সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। তিনি মূলত উপজেলা বিআরডিবি অফিসের নাইট গার্ড হিসেবে কর্মরত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাহিদ উপজেলা বিআরডিবি অফিসের নাইট গার্ড হিসাবে দায়িত্বে থাকলেও সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সব কাজ করেন।
খাল খনন প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক মুন্না মিয়া ও ও মাহাবুর রহমান জানান, আমরা তিনজন এখানে কাজ করি। কাজ দেখাশোনার জন্য জাহিদ প্রতিদিন আমাদের ৮০০ টাকা দেয়। সরকারি ভাবে তালিকা ভুক্ত কোনো শ্রমিক এখানে নেই।
অভিযোগের বিষয়ে নাইট গার্ড জাহিদ বলেন, আমি কোনো অফিসার নই, টাকা-পয়সা দেওয়ার আমি কে? স্যার (পিআইও) আমাকে যা করতে বলেন, আমি শুধু সেটাই করি।
কমিটির সদস্য ও স্থানীয় জামায়াতের আমির রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি এই প্রকল্পের একজন সদস্য, অথচ আমাকে না জানিয়েই কে বা কারা খননকাজ শুরু করে দিল আমি জানি না। এর সুষ্ট তদন্ত হওয়া দরকার।
পদুমশহর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য মৌসুমি বেগম জানান, চেয়ারম্যানের কাছে শ্রমিকের তালিকা দিয়েছি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জটিলতার কথা জানলেও ভেকু দিয়ে কাজ করানোর বিষয়টি জানেন না তিনি।
তবে প্রকল্পটির সদস্য সচিব ও ইউপি সদস্য রোস্তম আলী ভেকু ব্যবহারের কথা স্বীকার করে বলেন, শ্রমিকদের তালিকা এখনও শেষ হয়নি, তাই আপাতত ভেকু দিয়ে কাজ চলছে। তালিকা শেষ হলে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হবে।
প্রকল্পের সভাপতি ও পদুমশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল হক দাবি করেন, শ্রমিক তালিকা প্রায় শেষ। আমরা দু-একদিনের মধ্যেই প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করব। তবে ভেকু দিয়ে কাজ করার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মেহেদী হাসান জানান, প্রাথমিকভাবে ভেকু দিয়ে খালের তলাটা সমান করছি। শ্রমিকের তালিকা এখনও শেষ করা হয়নি। ভেকু দিয়ে খনন শেষে শ্রমিক দিয়ে ফিনিশিং দেওয়া হবে।
অভিযুক্ত জাহিদ পিআইও কার্যালয়ের কোনো দায়িত্বে আছেন কি না়? এমন প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান মেহেদী হাসান।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আশরাফুল কবির জানান, খনন কাজটি পিআইও অফিস ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ করছেন। সেখানে কোনো অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। সুনির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।