PriyoKhobor-PNG
বুধবার, ৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, দুপুর ২:২১
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আবহাওয়া
  6. কৃষি
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চাকরি
  10. জাতীয়
  11. ট্যুরিজম
  12. দেশজুড়ে
  13. ধর্ম
  14. নির্বাচন
  15. প্রবাসের খবর

রক্তের অক্ষরে লেখাজুলাই, এক জাতির জাগরণ, এক নতুন বাংলাদেশের জন্মকথা

দৈনিক গণআওয়াজ
আগস্ট ৫, ২০২৬ ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
| 10
Link Copied!

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

ইতিহাসের কিছু মাস কখনো কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় বন্দি থাকে না তারা রূপান্তরিত হয় জাতির সমষ্টিগত স্মৃতিতে, রক্তের অক্ষরে লেখা এক অবিনশ্বর অধ্যায়ে। বাংলাদেশের জন্য ২০২৪ সালের জুলাই মাস ঠিক তেমনই এক অধ্যায়, যাকে ইতিহাস স্মরণ রাখবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে।

এই আন্দোলনের শিকড় প্রোথিত ছিল ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের সমন্বিত প্রবাহে, যার সূচনা সেই বছরের ৫ জুন যেদিন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট, এই দুই মাসের ব্যবধানে অগণিত প্রাণের বিসর্জনের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে বিগত ষোলো বছরের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের।

আন্দোলনের সূচনা ছিল নিতান্তই একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে সরকারি চাকরিতে অন্যায্য কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুর প্রতিক্রিয়া সেই সীমিত দাবিকে রূপান্তরিত করে দেয় এক সর্বাত্মক গণআন্দোলনে। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করায় শিক্ষার্থীরা সারাদেশে তাদের বিক্ষোভ আরও তীব্র করে তোলে।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে ছাত্র-জনতার জোরালো উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ সমাজ এবং পেশাজীবীদের বিশাল অংশ সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়।

তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মান্তিক, আর একই সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি ছিল তরুণ প্রাণের আত্মাহুতি। জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে বিক্ষোভের সময় কমপক্ষে বত্রিশজন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এই আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র ছিল বহুমাত্রিক। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও নারী, শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী, আলেম, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে একটি সর্বজনীন গণ-আন্দোলনে পরিণত করে। তরুণ প্রজন্মের এই রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ ছিল জুলাইয়ের অন্যতম ঐতিহাসিক অর্জন, যা প্রমাণ করে দিয়েছিল রাষ্ট্র কেবল শাসকের বিষয় নয়, বরং নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণই রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি।

আন্দোলনের ভাষাও বদলে যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি হত্যার প্রতিবাদে দৃঢ়তর হয় প্রতিজ্ঞা। ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করেই তাঁরা পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হবেন। এই ঘোষণার পরই আন্দোলনটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় “জুলাই বিপ্লব” নামে। পরবর্তীতে ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই অভ্যুত্থানকে অভিহিত করেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান হিসেবে।

★ সীমান্ত পেরিয়ে এক অভিন্ন কণ্ঠস্বর

জুলাইয়ের এই জাগরণ কখনোই বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় বন্দি থাকেনি। যখন দেশের রাজপথে ছাত্র-জনতা রক্ত দিচ্ছিল, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি। ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও কমিউনিটি নেতারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে একটি জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও নিজ নিজ ক্যাম্পাসে প্রতিবাদী সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মিশরের ইলমের কাবা খ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও, যাঁরা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কায়রোর মাটিতে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ তুলেছিলেন প্রতিবাদের।

কিন্তু কায়রোর সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরও এক নীরব, আরও এক গভীরতর যন্ত্রণার অধ্যায় যা কোনো স্লোগানে ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে কেবল অপেক্ষার নিঃশব্দ প্রহরে। যখন দেশে নেমে আসত ইন্টারনেট বন্ধের নিষ্ঠুর অন্ধকার, তখন আল-আজহারের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একেকটি দিন হয়ে উঠত অনন্তকালের মতো দীর্ঘ। দিন পার হয়ে যেত, রাত পার হয়ে যেত দেশের কোনো খবর নেই, পরিবারের কোনো খবর নেই। মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই প্রতীক্ষার প্রতিটি মুহূর্তে বুকের ভেতর বাজত এক অজানা আশঙ্কার দামামা। শরীর তাঁদের পড়েছিল আল-আজহারের ক্লাসরুমে, নীলনদের তীরে, কিন্তু হৃদয় পড়ে ছিল সুদূর বাংলাদেশে, প্রিয় শহরের অলিগলিতে, মায়ের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে।

অবশেষে যখন নেটওয়ার্ক ফিরত, স্ক্রিন আলোকিত হয়ে উঠত একের পর এক ভয়ংকর সংবাদে কারও পরিবারের ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ, কারও বোনের। যে খবরের অপেক্ষায় প্রতিটি মুহূর্ত ছিল দুঃসহ, সেই খবর যখন আসত, তা প্রায়ই আসত এক টুকরো কাফনের মতো ভারী হয়ে। এমন কোনো রাত ছিল না, যে রাতে দেশের জন্য দোয়া ওঠেনি তাঁদের ঠোঁটে। তাহাজ্জুদের নামাজে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতেন তাঁরা, কুরআন খতম করতেন একের পর এক, যেন প্রতিটি আয়াতের মধ্য দিয়ে পৌঁছে দিতে চাইতেন নিজেদের নিঃশব্দ আর্তি সেই সুদূর মাতৃভূমির জন্য। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বসে দোয়ার হাত তুলেই যেন তাঁরা লড়েছিলেন এক নিঃশব্দ যুদ্ধ, যে যুদ্ধের কোনো ভিডিও নেই, কোনো স্লোগান নেই আছে শুধু ভেজা জায়নামাজ আর রাতের নির্জনতায় উচ্চারিত ফিসফিসে ফরিয়াদ।

অবশেষে যেদিন বাংলাদেশ মুক্তির স্বাদ পেল, সেদিন কায়রোর প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ঘরে ঘরে নেমে এসেছিল আনন্দের ঢল। উৎসব আয়োজন করে, মিষ্টিমুখ করে তাঁরা উদযাপন করেছিলেন সেই মুক্তি, যার জন্য এত রাত নির্ঘুম কেটেছে, এত দোয়া উচ্চারিত হয়েছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। আর সেই আনন্দের মধ্যেও তাঁদের ঠোঁটে ভেসে উঠেছিল আরেকটি নীরব প্রার্থনা যেন আর কখনো এমন দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে হয় তাঁদের প্রিয় মাতৃভূমিকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে আয়োজিত মানববন্ধন, দূতাবাসের সামনে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ এই সবকিছু মিলিয়ে প্রবাসী ও বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছিলেন এক আন্তর্জাতিক চাপ, যা দেশীয় আন্দোলনের সঙ্গে মিলে সরকারের ওপর তৈরি করে বহুমুখী চাপ। কিন্তু এই সম্মিলিত প্রয়াসের পেছনে যে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, যে নিঃসঙ্গ প্রতীক্ষা আর অশ্রুসিক্ত দোয়ার ইতিহাস লুকিয়ে ছিল, তা প্রমাণ করে দেয় একটি জাতির ন্যায়বিচারের সংগ্রাম কখনো একক ভূখণ্ডের বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে গোটা প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অভিন্ন এক আত্মপরিচয়ের লড়াই, এক অভিন্ন হৃদয়ের স্পন্দন।

★ এক নতুন বাংলাদেশের ভোর

দীর্ঘ দুই মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন দীর্ঘ ষোলো বছরের শাসনের অবসান। ২০২৪ সালের এই গণআন্দোলন বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক একটি ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই আন্দোলন কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং প্রতিবাদের এক স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতি।

এই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, ছাত্রসমাজ কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার্থী নয় বরং তারা এই জাতির বিবেক, অন্যায় দেখলে জেগে ওঠা বুকের অগ্নিশিখা, আর তাদের লড়াই কেবল নিজেদের জন্য নয়, সমাজের প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের অধিকারের জন্য। ২০২৪ সালের জুলাই তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যা কখনো ম্লান হবে না এই মাস চোখের সামনে তুলে ধরেছিল অন্যায়, অবিচার ও বঞ্চনার ভয়ংকর রূপ, আর একই সঙ্গে প্রমাণ করেছিল ছাত্রসমাজের অদম্য সাহস আর সাধারণ মানুষের ঐক্য কতটা অপ্রতিরোধ্য হতে পারে।

আজ যখন পেছন ফিরে তাকানো হয় জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোর দিকে, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি সত্য এই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতনের গল্প নয়, বরং এক প্রজন্মের জাগরণের গল্প, যেখানে দেশের ভেতরে রাজপথে আর দেশের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে, এমনকি নির্ঘুম রাতের সিজদায়ও, একই স্বপ্ন, একই ক্ষোভ, একই আকাঙ্ক্ষা একত্র হয়ে রচনা করেছিল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। ঢাকার শহীদ মিনার থেকে কায়রোর আল-আজহার পর্যন্ত বিস্তৃত এই ঐক্যের চিত্র বাংলাদেশের নবপ্রজন্মের কাছে চিরকাল থেকে যাবে এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে এই সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে যে, সীমান্ত যত দূরেই হোক, ন্যায়বিচারের ডাক আর ভালোবাসার প্রার্থনা কখনো থেমে থাকে না।

লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর

আরও পড়ুনঃ  নতুনতারা আয়োজিত ১৬৫তম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উৎসব বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত 
আজকের সর্বশেষ সবখবর
  • BD IT HOST

  • আপনার এলাকার খবর খুঁজুন

    খুঁজুন
  • Design & Developed by: BD IT HOST