
মিসেস চামেলী আক্তার প্রিয়া
সকাল থেকেই আকাশটা ছিল মেঘে ঢাকা,
রোদ ছিল—তবু ছিল না রোদের সেই মায়া,
ঠিক তেমনই মনির মন,
আলো ছিল—তবু আনন্দ ছিল না।
জানালার পাশে বসে সে,
হাতে পুরোনো একখানা বই,
চোখ কিন্তু পাতায় নেই—
চোখ তার পথের দিকে,
হয়তো উজ্জ্বল আসবে,
হয়তো বলবে—
“মনি, এত অভিমান কেন?”
গতকাল যে বলেছিল সে—
“কাল তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে,
তুমি শুধু অপেক্ষা করো।”
সেই একটি কথাতেই
মনির বুকের ভেতর
জ্বলে উঠেছিল আশার ছোট্ট প্রদীপ।
দুপুর গেল,
বিকেল গেল,
সন্ধ্যার আঁধার নেমে এলো—
তবু উজ্জ্বল এলো না।
ফোনের পর্দায়
বারবার থেমে গেল মনির আঙুল,
একবার ফোন করবে ভেবে
আবার সরিয়ে নিল হাত।
অভিমান বলল—
“না, তুমি কেন আগে যাবে?”
ভালোবাসা বলল—
“একবার শুধু খবর নাও।”
শেষ পর্যন্ত জিতে গেল অভিমান।
মনি নিজেকেই বলল—
“যার আসার কথা,
সে যদি না আসে,
তবে আমি কেন অপেক্ষা করব?”
রাত আরও গভীর হলো।
নিস্তব্ধ ঘরে হঠাৎ
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
মনির বুকের ভেতর
কেমন যেন কেঁপে উঠল।
দরজা খুলে দেখে—
উজ্জ্বল দাঁড়িয়ে আছে।
ভেজা জামা, ক্লান্ত চোখ,
হাতে ছোট্ট একটি প্যাকেট—
কত না বলা কথা যেন
লুকিয়ে আছে তার নীরবতায়।
মনি মুখ ফিরিয়ে বলল—
“এত রাতে আসার কী দরকার ছিল?”
উজ্জ্বল কোনো উত্তর দিল না,
শুধু প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
“তোমার জন্য এনেছিলাম।”
প্যাকেট খুলতেই
মনির চোখ থমকে গেল—
ভেতরে একটি নীল শাড়ি,
যেন মেঘলা আকাশে
হঠাৎ নেমে এলো নীলের আলো।
উজ্জ্বল মৃদু হেসে বলল—
“আজ তোমার জন্মদিন,
মনে আছে তো?”
মনি স্তব্ধ হয়ে গেল—
সত্যিই তো আজ তার জন্মদিন!
তবু সারাদিন
কেন কোনো খবর নিল না সে?
উজ্জ্বল ধীরে ধীরে বলল—
“সকালে তোমার জন্য
এই শাড়িটা কিনতে গিয়েছিলাম।
ফেরার পথে শুনলাম,
বাবা হঠাৎ অসুস্থ।
হাসপাতালে ছুটতে হয়েছিল,
ফোনটাও ছিল নিঃশব্দ,
চার্জ ছিল না—
তবু বিশ্বাস করো,
এক মুহূর্তের জন্যও
তোমাকে ভুলিনি।”
মনির চোখের কোণে
জমে থাকা অভিমান
অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ল।
সে শুধু বলল—
“একটা ফোন করতে পারতে…”
উজ্জ্বল মাথা নিচু করে বলল—
“পারিনি।
আর সেই না-পারাটাই
হয়তো আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
কিছুক্ষণ নীরবতা—
দুজনের মাঝখানে
শুধু জমে থাকা কথা।
বাইরে তখন বৃষ্টি নামে,
বিদ্যুৎ চমকে ওঠে আকাশে,
মেঘের বুক চিরে
আলো এসে পড়ে ঘরে।
মনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
আস্তে করে বলল—
“আমিও ভুল করেছি।
তোমার ওপর রাগ করে
একবারও জানতে চাইনি
কী হয়েছিল তোমার।”
উজ্জ্বল মৃদু হেসে বলল—
“অভিমান থাকুক,
ভালোবাসার মতোই থাকুক—
শুধু তার আড়ালে
মানুষটাকে যেন হারিয়ে না ফেলি।”
মনি তাকিয়ে রইল,
চোখে তখন আর অভিমান নেই,
শুধু ভালোবাসার নরম আলো।
বৃষ্টি থেমে গেছে,
মেঘ সরে গেছে ধীরে,
কালো আকাশের ফাঁক গলে
চাঁদ উঠেছে নীরবে।
মনি নীল শাড়িটা
বুকে জড়িয়ে বলল—
“চলো,
আজ আমার জন্মদিনটা
আবার নতুন করে শুরু করি।”
উজ্জ্বল হাসল,
সেই হাসিতে যেন
সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান।
আর জানালার ওপারে,
মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে
চুপিচুপি দূরে সরে গেল—
অভিমানের মেয়ে।
কারণ অভিমান তো
ভালোবাসারই নীরব ভাষা,
তবু সে ভাষা দীর্ঘ হলে
কখনো কখনো
হারিয়ে যেতে পারে
সবচেয়ে আপন মানুষটিও।
তাই ভালোবাসার কাছে
অভিমান থাকুক—
কিন্তু দূরত্ব নয়;
চোখে জল থাকুক—
কিন্তু বিচ্ছেদ নয়;
আর হৃদয়ের কাছে হৃদয় থাকুক—
যতদিন বেঁচে থাকে
ভালোবাসার গল্প।


