রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা আজও জাতির হৃদয়ে এক দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। ২০২৫ সালের সেই অভিশপ্ত জুলাইয়ের তপ্ত দুপুরে আমরা হারিয়েছিলাম এক অকুতোভয় প্রাণ- শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী। আগুনের সেই লেলিহান শিখা যখন চারপাশ গ্রাস করছিল, তখন নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনতে গিয়ে তিনি যেভাবে নিজেকে আগুনের শিখায় সঁপে দিয়েছিলেন, তা কেবল শিক্ষকতার আদর্শ নয় বরং মানবতার ইতিহাসে এক বিরল ও মহিমান্বিত দৃষ্টান্ত।১৬ এপ্রিল ২০২৬, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মাহেরীন চৌধুরীর অসামান্য এই আত্মত্যাগকে জাতি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (মরণোত্তর) প্রদানের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় করে রাখল। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তাঁর শোকাতুর স্বামীর এই পুরস্কার গ্রহণ কেবল একটি পদকপ্রাপ্তি নয় বরং এটি এক নিঃস্বার্থ বীরত্বের প্রতি রাষ্ট্রের পরম শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং জাতির পক্ষ থেকে দেওয়া এক গভীর ভালোবাসার স্মারক।
একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, তিনি আপদকালীন সময়ে অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মাহেরীন চৌধুরী তা প্রমাণ করেছেন নিজের জীবন দিয়ে। উত্তরার সেই ক্লাসরুম যখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আর মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ছিল, তখন নিজের নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে না ছুটে তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে। প্রতিটি শিশুকে আগুনের মুখ থেকে সরিয়ে নিতে গিয়ে তিনি নিজে যে দহন সয়েছেন, সেই ক্ষত আজ এক পবিত্র তিলকে পরিণত হয়েছে। নীলফামারীর জলঢাকার সেই কৃতি সন্তান আজ আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের নন, তিনি আজ সারা বাংলার গর্ব, আমাদের সকলের ‘মাহেরীন আপা’।স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬-এর তালিকায় যখন শহীদ মাহেরীন চৌধুরীর নাম উচ্চারিত হয়, তখন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বীরত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজসেবা ও জনসেবার যে মহান ব্রত তিনি পালন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনন্তকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। তাঁর এই আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীতে স্বার্থের চেয়েও বড় কিছু আছে, আর তা হলো অপরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।
আমরা মাহেরীন চৌধুরীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। একইসাথে অভিনন্দন জানাই স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্যান্য গুণীজন ও প্রতিষ্ঠানকে। মাহেরীন চৌধুরীর মতো মানুষেরা চলে গিয়েও আমাদের শিখিয়ে যান- জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও ত্যাগ অমর। রাষ্ট্র আজ তাকে সম্মান জানিয়ে প্রকারান্তরে মানবিক মূল্যবোধ এবং মমত্ববোধকেই আজ বিশ্বদরবারে সম্মানিত করল।
স্মৃতিতে অম্লান থাকুক সেই বীর শিক্ষিকা, যার সাহসী ও মমতাভরা হাতগুলো রক্ষা করে গিয়েছিল আগামীর বাংলাদেশকে। তাঁর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল প্রজ্জ্বলিত থাকুক এক অনির্বাণ শিখার মতো।