জমি নিয়ে বিরোধে দেশের বহু পরিবার বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরছে। জাল কাগজপত্র দিয়ে বা প্রকৃত জমির তুলনায় বেশি জমি রেজিস্ট্রি, খারিজ ও রেকর্ড দিয়ে থাকে জমিসংক্রান্ত তিনটি দপ্তর। অর্থাৎ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি, ভূমি অফিসে নামজারি ও সেটেলমেন্টে রেকর্ডের অসংগতির অভিযোগ রয়েছে। অনেক পারিবারিক সম্পত্তি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি হস্তান্তর নিয়ে ছেলে-মেয়ের মধ্যে বৈষম্য এবং জমি নিয়ে বিরোধে মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-মামা ও নাতিদের সম্পর্কেও ফাটল ধরছে। এসব জটিলতায় অনেক পরিবার বছরের পর বছর মামলা ও বিরোধ চলছেই।এমন পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে জমির রেকর্ড, খারিজ ও খাজনার কাগজপত্র যাচাই না করে তিনটি দলিলে ৯৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহফুজার রহমান ও দলিল লেখক মো. রেজাউল করিম (লাইসেন্স নম্বর ৭৩) সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৬ সালের মতো সময়ে ২০ এপ্রিল কোরআন শরীফ, টুপি, তসবি ও জায়নামাজের বিনিময়ে জমি হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করে তিনটি দলিল সম্পাদন করা হয়। এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন ইসলামপুর গ্রামের মৃত জামাল উদ্দিন শিকদারের ছেলে মো. মিজানুর রহমান শিকদার ও পশ্চিম ছাট গোপালপুর গ্রামের মৃত মজিবর রহমানের ছেলে মো. তোরাফ আলী।তাঁরা জানান, ২০২৪ সালে ৩৯৭৪/৯২ ও ৩৫৯৪/০৫ নম্বর দলিলের সূত্রে ৪৩৪০৮১৩ নম্বর নামজারি আবেদনের মাধ্যমে ৭৫৬০ দাগে তোরাফ আলী ও মাজেদা খাতুনের নামে ১৬ শতক জমির ২১৬৪ নম্বর খতিয়ান এবং ২০২৫ সালে ৩৯৭৪/৯২ নম্বর দলিলের সূত্রে ৪৫০৬০৫২ নম্বর নামজারি আবেদনের মাধ্যমে ১২ জন ওয়ারিশের নামে ৩২ শতক জমির ২৫-২১৭৫ নম্বর খতিয়ান প্রস্তুত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁরা এসব জমি ভোগদখল ও খাজনা পরিশোধ করে আসছেন।গত সেপ্টেম্বর মাসে তাঁরা জানতে পারেন, ভূরুঙ্গামারী সিভিল জজ আদালতে ১১২/২৬ নম্বর মামলা হয়েছে। শহিদুল ও তাঁর ছেলে মনিরুজ্জামান, আব্দুল মজিদ, জহিরের স্ত্রী শাহনাজ এবং আয়নালের ছেলে রুবেল বাদী হয়ে কুমরের ছেলে গাজিউর গংদের বিরুদ্ধে প্রজাস্বত্ব বিদ্যমান থাকার মর্মে ঘোষণামূলক ডিক্রি চেয়ে মামলাটি করেন।পরে কাগজপত্র সংগ্রহ করে তাঁরা দেখতে পান, গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ৮৭৭/২৬, ৮৭৮/২৬ ও ৮৭৯/২৬ নম্বর তিনটি দলিল সম্পাদন করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জমির রেকর্ড, দখল ও খাজনার কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জমি নিয়ে আরও বিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।অভিযোগকারী মিজান শিকদার বলেন, আমার মা আর.এস. ৭০৬ রেকর্ডের মালিক কুমর উদ্দিনের ছেলে গাছিউরের কাছ থেকে ১৩১ শতক জমির ৪৮ শতক কেনেন। পরে অর্থের প্রয়োজনে তোরাফ আলীর কাছে ১৬ শতক বিক্রি করেন। জমি আমরা ভোগদখল করে আসছি। আমার মা মারা গেলে আমাদের ওয়ারিশদের নামে নামজারি ও খাজনা খারিজ রয়েছে। বিভাগীয় তদন্ত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।অভিযোগকারী তোরাফ আলী বলেন, আমি মিজান শিকদারের মায়ের কাছ থেকে ৪৮ শতক জমির মধ্যে ১৬ শতক কিনে নিয়ে ভোগদখল করে আসছি। মিজান শিকদারদের জমি প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে কেনা। এ নিয়ে বিচার-সালিশ চলছে। জানতে পেরেছি, আমাদের বিরোধী পক্ষ মনির ও মজিদ গং ভুয়া আমমোক্তারনামা করে নিয়ে দলিল করে নিয়েছে।অভিযোগ বিষয়ে মনির বলেন, আমরা গাজিউর রহমানের কাছ থেকে ৯২ সালে ৮১ শতক জমি কিনে নিই। এ ছাড়া আরও জমি কিনে নিই। তবে উক্ত জমি নিয়ে গাজিউরের সঙ্গে বিরোধ হয়। আমাদের দুই মাস পরে মিজানুরের মায়ের নামে ৪৮ শতক কিনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তোরাফ গং ১৬ শতক কিনে নেয়। গাজিউর দখলে থাকাবস্থায় তাঁর নামে রেকর্ড করে নেন। পরে যখন জানতে পারি, গাজিউরের জমি টিকবে না, তখন তাঁর রেকর্ড বাতিলের জন্য মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এস.এ. ও সি.এস. রেকর্ডের মালিকের ওয়ারিশ খুঁজে পাই, যাঁরা আমমোক্তারনামা মূলে মালিক। পরে ২০২৬ সালে এই তিনটি দলিলে ৯৫ শতক জমি কোরআন শরিফ, তসবি ও জায়নামাজ বিনিময়ে ওয়ারিশগণ লিখে দেন। বর্তমানে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। যদি কাগজপত্র অনুযায়ী আদালতে মামলায় রায় পাই, তখন লেনদেন বিষয়ে কথা হবে। আমরা বর্তমানে ৯৫ শতক জমি দখলভোগ করে আছি। তোরাফ যে ১৬ শতক কিনে দখলভোগ করছে, সেখানে আমাদের দাবি নেই। তবে মিজান শিকদারদের দখলে নেই, তাঁরা জমি পাবেন না। কেন পাবেন না, এ বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জমির হিসাব-নিকাশের পর আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করবে।বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী দুই উপজেলায় দায়িত্বে রয়েছেন। জানা গেছে, কিছু অসাধু দলিল লেখক উপজেলার কিছু দোকানে এবং নিজস্ব কম্পিউটার বা ল্যাপটপে ভুয়া খতিয়ান, খারিজ ও খাজনার কাগজ তৈরি করে জাল স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে ওই ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া বর্তমানে কিউআর কোডের মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাইয়ের সুযোগ থাকলেও যেগুলো ভুয়া, সেগুলো থেকে সাব-রেজিস্ট্রার মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পাদন করেন। কারও ফ্রেশ কাগজপত্র থাকলেও নির্দিষ্ট হারে টাকা উৎকোচ হিসেবে নিয়ে থাকেন। তবে এসব বিষয়ে কেউ সরাসরি বলতে চান না।দলিল সম্পাদনের সময় প্রতি টিপ-স্বাক্ষরের জন্য ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যা সাব-রেজিস্ট্রারের সামনেই অফিসকক্ষে নেওয়া হয়। জানা গেছে, উক্ত টাকা থেকে কোর্ট মসজিদে ৮ হাজার, থানা মসজিদে ৫ হাজার, একটি কেজি স্কুলে ৩ হাজার এবং একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ৩ হাজার করে মোট ১৯ হাজার টাকা প্রতি মাসে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাকি টাকা কর্মচারীরা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেন বলে তথ্যসূত্রে জানা গেছে। যা গত মাসেও দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য প্রদানকারী জানান। তিনি বলেন, এই টাকা নেওয়া ও দেওয়া—দুটোরই নিয়ম নেই।দলিল লেখক রেজাউল করিম জানান, জমিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে ঝামেলা চলছে। সঠিক কাগজপত্র দিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হবে, আমরা কাগজপত্র দিয়েছি। আমাদের স্যার সেখানে সব কাগজ জমা দেবেন। যারা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের জমি দখলে নেই। মিথ্যা অভিযোগ দেওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহফুজার রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জমিতে যাঁরা ভোগদখলে আছেন, তাঁরাই দলিল করেছেন। অভিযোগকারীদের নামে খারিজ থাকলেও জমিতে তাঁদের দখল নেই। মূল মালিকরা সরকারের কাছ থেকে বয়নামা দলিলের মাধ্যমে জমি পেলেও পরে একটি জাল দলিলের মাধ্যমে অন্য নামে বিএস রেকর্ড করা হয়। অভিযোগকারীরা ওই ভুল রেকর্ডের মালিকের কাছ থেকে জমি কেনেন। বর্তমান মালিকরা মামলা-জটিলতা এড়াতে একটি ‘না-দাবি দলিল’ করেছেন। তবে বিষয়টি আগে জানলে তিনি দলিল রেজিস্ট্রি সম্পাদন করতেন না।মামলা চলমান থাকলেও দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামলার সঙ্গে রেজিস্ট্রির সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও আইজিআর কার্যালয় তদন্ত করবে এবং তিনি সেখানে নিজের বক্তব্য দেবেন। প্রতি টিপ-স্বাক্ষরের জন্য ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ওই টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে তথ্য নিয়ে জানা গেছে, তা চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে অনলাইনে দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলমান। খুব দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। তখন আর এত ঝামেলা হবে না।
অভিযোগকারীদের ২০২৪ সালের নামজারির সময় দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ভূমি কর্মকর্তা তাহমিদুলের কাছে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে খারিজ করা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো সেখানে নেই। অনেক আগের বিষয়, মনে নেই।’ পরে খোঁজ নিয়ে জানাবেন বললেও তিনি আর তথ্য জানাননি। বর্তমানে তিনি পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুড়িগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি ছুটিতে ছিলাম, চিঠি পেয়েছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নাজির হোসেনকে বিষয়টি অবগত করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির কাগজপত্র, রেকর্ড ও দখল নিয়ে নানা জটিলতা থেকে বিরোধের সৃষ্টি হয়। জমির দাম বাড়ায় মানুষ এখন এ বিষয়ে বেশি সচেতন হলেও সাব-রেজিস্ট্রি, ভূমি ও সেটেলমেন্ট অফিসে অনিয়মের অভিযোগ আগেও ছিল, এখনো রয়েছে।
অভিযোগকারীরা জমিসংক্রান্ত দপ্তরের অনিয়ম রোধ ও জনগণের ভোগান্তি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁরা অন্তত এক বছরের দলিলের সঙ্গে জমা দেওয়া কাগজপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত, অনিয়মের চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।