আজ পহেলা বৈশাখ। প্রকৃতিতে রুদ্র ঝড়ের তান্ডব শেষে যখন ভোরের স্নিগ্ধ আলো নতুন বছরের বার্তা নিয়ে আসে, তখন বুকের গহীনে নস্টালজিয়ার এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে। আজ থেকে ৩৩ বছর আগের ঠিক এমন এক দিনে, ১৪০০ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে ঝিনাইদহ জেলার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়েছিল এক নতুন সংবাদের ঘ্রাণে।
আজ যখন ডিজিটাল স্ক্রিনে খবরের মিছিল দেখি, তখন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে সেই ধূসর দিনগুলোতে, যেখানে সাংবাদিকতা ছিল কেবল পেশা নয়, বরং একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আমার সাংবাদিকতা জীবনের গোড়াপত্তন হয়েছিল ঝিনাইদাহ জেলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক নবচিত্র পত্রিকার মধ্য দিয়ে। ২০০৮ সালে এলাকা প্রতিনিধি হিসেবে দৈনিক নবচিত্র পত্রিকায় আমি লেখার সুযোগ পাই। তারপর ২০১৫ সালে বিভিন্ন জাতীয় পত্র পত্রিকাতে লেখালেখি সুযোগ পায়। জাতীয় পত্রিকাতে লেখার মধ্য দিয়ে পরিচয় হয় সাংবাদিক জগতের আইকন এবং মহাগুরু ও একাধিক পত্রিকার সম্পাদক আলী কদর পলাশ স্যারের সাথে। আলী কদর পলাশ স্যারের দৈনিক এই আমার দেশ ও মিনিস্টার গ্রুপের দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ পত্রিকার ব্যবস্থাপনার সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়। দীর্ঘদিন স্যারের সাথে পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম সম্পর্ক। পলাশ স্যার কখনোই আমাকে তার পত্রিকার একদম কর্মচারী হিসাবে দেখেনি বরং তার সন্তানের মত আমাকে ছায়ার মত সব সময় নজরে রেখে শিক্ষা প্রদান করেছেন। আমি তার কাছে চির কৃতজ্ঞ। দৈনিক নবচিত্র ১৯৯৪ সাল হতে এখন পর্যন্ত পত্রিকাটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থেকে। পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক আলহাজ্ব শহিদুল ইসলাম অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে পত্রিকাটি আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন। তারই দিকনির্দেশনায় এবং তার শিক্ষা অনুসরণ করে আজও দেশের মানুষের জন্য কলম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। দীর্ঘ ১৭ বছর সাংবাদিকতা জীবনে বহু হামলা মামলা জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েও সাংবাদিকতা পথ থেকে কখনোই সিটকে পড়িনি। যত বাধাই আসুক না কেন সবকিছু অতিক্রম করে সত্যকে সামনে আনার চেষ্টা আজও চালিয়ে যাচ্ছি।
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তখন হৃদয়ের ভেতরে এক অদ্ভুত তাগিদ ছিল প্রতিবেশী জেলার মানুষের জন্য কিছু করার। সেই তাগিদ থেকেই জন্ম নেয় দৈনিক গণআওয়াজ।
মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আজকের মতো হাতের মুঠোয় পৃথিবী ছিল না। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল পদে পদে।
সারাদিন সংবাদ সংগ্রহ, হাতে লিখে কম্পোজ করা, আর বিকেলে সেই ম্যাটার নিয়ে ছোটছুটি- সে এক অন্যরকম উন্মাদনা।
রাতভর প্রেসে বসে থেকে ভোরের আলো ফোটার আগে যখন পত্রিকার প্রথম কপিটি হাতে আসত, তখন শরীরের সব ক্লান্তি যেন ওই নতুন কালির গন্ধে কর্পূরের মতো উড়ে যেত।
দেশের মানুষের হাতে তাদের নিজেদের ভাষায় লেখা প্রথম দৈনিকটি পৌঁছে দেওয়ার আনন্দ ছিল যেকোনো প্রাপ্তির চেয়ে বড়।
আজ পহেলা বৈশাখের এই শুভক্ষণে যারা আমাদের মাঝে নেই, সেই সব গুণী মানুষদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তাঁদের ত্যাগ আর মেধা মিশে আছে এই পত্রিকার প্রতিটি ছত্রে।
একটি সংবাদপত্র কেবল খবর ছাপার কাগজ নয়, এটি একটি জনপদের দর্পণ, ইতিহাসের সাক্ষী। -এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা কেবল খবর দেইনি বরং মানুষের স্বপ্ন আর যন্ত্রণাকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছি।
বৈশাখের সেই রুদ্র রূপ যেমন জরাজীর্ণকে ধুয়ে-মুছে দিয়ে নতুনের জয়গান গায়, আমরাও চেয়েছিলাম সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দূর করতে।
আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই ভোরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সময় কত দ্রুত বয়ে যায়! তবে কবিতার সেই অমোঘ সত্য আজও প্রাসঙ্গিক। -“যতই ঝড় উঠুক সাগরে, তবু তরী বাইতে হবে”। -সেই তরী বাওয়ার নেশাতেই আজও কলম সচল রেখেছি। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আমার অগণিত পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি, যারা দীর্ঘ তিন দশক ধরে আমার এই সাংবাদিকতা জীবনের সাথী হয়েছেন।
নতুন বছর বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ।
আমাদের সাংবাদিকতার এই নিরন্তর অভিযাত্রা যেন কখনোই পথ না হারায়। জীর্ণ পুরাতন বিদায় নিক, জয় হোক নতুনের।