কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার দ্বাড়িয়াকান্দি-ডুমরাকান্দা সড়কের নির্মাণাধীন কালভার্টের গর্তে পড়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মো. আব্দুস সাত্তার (৫৫)। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার করুণ পরিণতি?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে সড়কটির কালভার্ট নির্মাণকাজ চললেও সেখানে নিরাপদ বিকল্প রাস্তা, পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা রাতের আলোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। অথচ এটি এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়ক, যেখানে প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও পথচারী চলাচল করেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণাধীন স্থানের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরাও বিষয়টি নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা দিলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাদের।
নিহত আব্দুস সাত্তারের স্বজন ও এলাকাবাসীর প্রশ্ন, একটি বড় গর্ত খুঁড়ে রেখে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া মানুষের চলাচল কীভাবে অব্যাহত রাখা হলো? একের পর এক ছোট-বড় দুর্ঘটনার পরও কেন সংশ্লিষ্টদের টনক নড়েনি?
ঘটনার পর উপজেলা প্রকৌশলী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি এ বিষয়ে লিখিত চিঠিও দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু নির্দেশনা দিয়েই কি দায়িত্ব শেষ? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? কাজ বন্ধ রাখা, জরিমানা বা চুক্তি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল কি?
এলাকাবাসীর মতে, একজন নাগরিক যখন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকিতে প্রাণ হারান, তখন দায় শুধু ঠিকাদারের নয়; তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও দায় এড়াতে পারেন না।
প্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার প্রকল্পে একটি নিরাপদ বিকল্প রাস্তা নির্মাণ কিংবা কয়েকটি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা কি এতটাই কঠিন ছিল—এমন প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয়রা।
এই দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষ প্রাণ হারাননি; একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের অভিভাবককে। স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামীকে, সন্তানরা হারিয়েছে তাদের আশ্রয়স্থলকে। ফলে এই মৃত্যু ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ।
কুলিয়ারচরবাসী ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অবহেলা রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের জীবন অবহেলার কাছে জিম্মি হতে পারে না। আব্দুস সাত্তারের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, প্রকল্প তদারকি এবং মানবিক দায়িত্ববোধের ওপর বড় একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন পুরো কুলিয়ারচরবাসীর একটাই প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?