মানুষ জীবনে অনেক কিছু হারায়। কেউ হারায় স্বপ্ন, কেউ প্রিয়জন, কেউবা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অবলম্বন। কিন্তু মা-বাবাকে হারানোর বেদনা এমন এক গভীর শূন্যতা, যার ব্যাখ্যা ভাষায় দেওয়া যায় না। এ শোকের কোনো দৃশ্যমান রূপ নেই, তবুও এটি প্রতিনিয়ত মানুষের ভেতরটাকে ক্ষয়ে দেয়। পৃথিবীর কোনো পরিমাপক যন্ত্রই এই বেদনার গভীরতা নির্ণয় করতে পারে না। কারণ, মা-বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা কেবল সেই মানুষটিই উপলব্ধি করতে পারেন, যার মাথার ওপর থেকে চিরতরে সরে গেছে স্নেহ, মমতা, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের ছায়া।
জীবনের অনেক ঝড়-ঝাপটা মানুষ সামলে নিতে পারে, কিন্তু মা-বাবার মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যার সঙ্গে আপস করা যায় না। সময় হয়তো মানুষকে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায়, কিন্তু মা-বাবাকে হারানোর বেদনা কখনো মুছে দিতে পারে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের সাংবাদিক টিটু দীর্ঘদিন আগে হারিয়েছিলেন তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতাকে। ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর, ১৪ জিলহজ্জ শুক্রবার বাবা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। সেই শোকের ক্ষত পুরোপুরি শুকানোর আগেই চলতি বছরের ২৩ মে, ৪ জিলহজ্জ শুক্রবার না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তাঁর প্রিয় মা। বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে আজ তিনি নিজেকে সত্যিকার অর্থেই নিঃস্ব, অসহায় ও এতিম বলে অনুভব করছেন।
মায়ের মৃত্যুর পর থেকে যেন বদলে গেছে চারপাশের সবকিছু। ঘরের প্রতিটি কোণ, ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিস, এমনকি নীরবতারও যেন আলাদা একটি ভাষা তৈরি হয়েছে। যে ঘরে একসময় মায়ের স্নেহভরা ডাক শোনা যেত, আজ সেখানে শুধুই শূন্যতা, নীরবতা আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস। যে মানুষটি নিজের কষ্ট গোপন রেখে সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চাইতেন, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণে নিরলস সংগ্রাম করতেন, সেই মানুষটিই আজ মাটির বুকে চিরনিদ্রায় শায়িত।
জীবনের শেষ সময়গুলোতে মা সন্তানের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য উপদেশ, কিছু না বলা কষ্ট, কিছু অভিমান এবং অফুরন্ত মমতার স্মৃতি। সেই কথাগুলো আজও হৃদয়ের গভীরে অনুরণিত হয়। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেলেও মায়ের শেষ কথাগুলো প্রতিদিন নতুন করে নাড়া দেয়। একজন সন্তানের কাছে মায়ের স্মৃতি কখনো অতীত হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর, আরও বেদনাময় হয়ে ওঠে।
মায়ের চলে যাওয়ার পর চারপাশে মানুষ আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে, শুভাকাঙ্ক্ষী আছে—তবুও পৃথিবীটাকে এখন বড় অচেনা লাগে। সবাই সান্ত্বনা দেয়, ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়, সময়ের ওপর ভরসা রাখতে বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সময় হয়তো ক্ষতের ওপর প্রলেপ দেয়, কিন্তু মা হারানোর বেদনা কখনো মুছে দিতে পারে না। বরং প্রতিটি দিন মানুষকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীতে ‘মা’ নামের সেই নিরাপদ আশ্রয়টি আর নেই।
মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যার কোনো বিকল্প সৃষ্টি হয় না। মা তেমনই এক অনন্য আশ্রয়, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক। জীবনের প্রতিকূল মুহূর্তে, দুঃসময়ে কিংবা মানসিক অস্থিরতায় যার কাছে নিঃসংকোচে সব কথা বলা যেত, সেই মানুষটি আর পাশে নেই—এই উপলব্ধিই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। বিপদের মুহূর্তে মাথায় হাত রেখে যে বলতেন, “ভয় পাস না, আমি আছি”—সেই কণ্ঠস্বর আজ শুধুই স্মৃতি, শুধুই দীর্ঘশ্বাস।
মানুষের সামনে হাসিমুখে কথা বলতে হয়, স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে হয়। কিন্তু গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাগুলো আরও ভারী হয়ে ওঠে। অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে, অনেক অনুভূতি ভাগাভাগি করতে মন চায়; কিন্তু যাকে বলার জন্য মন আকুল হয়ে ওঠে, তিনি আর এই পৃথিবীতে নেই। এই বাস্তবতাই একজন সন্তানের জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য।
জীবনের প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহ অনেক আগ থেকেই ছিল। সংসারজীবনের প্রতিও কখনো খুব বেশি আকর্ষণ অনুভব করেননি তিনি। কিন্তু মায়ের ইচ্ছা, মায়ের স্বপ্ন এবং মায়ের অনুরোধেই সংসারের পথে হাঁটতে হয়েছিল। আজ সেই মাকেই হারিয়ে জীবনের অনেক কিছু অর্থহীন, নির্জীব ও তিক্ত বলে মনে হয়। কারণ, যাঁর জন্য অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যাঁর মুখের হাসি দেখার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছিল, তিনি আজ আর পাশে নেই।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—পৃথিবীতে এমন কেউ আর রইল না, যার কাছে নির্দ্বিধায় নিজের সব দুঃখ-কষ্ট উজাড় করে বলা যায়। এমন কেউ নেই, যিনি নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের কষ্ট নিজের কষ্ট মনে করবেন। মা চলে যাওয়ার পর মানুষ সত্যিকার অর্থেই বুঝতে পারে, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টি কত নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে।
তবুও একজন মুমিন হিসেবে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস—মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম রহমতের দরজা উন্মুক্ত রাখবেন। একদিন এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর জীবন শেষ হবে, আর পরকালে আবারও প্রিয় মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য দান করবেন। সেই আশাই আজ তাঁর হৃদয়ের একমাত্র সান্ত্বনা, একমাত্র অবলম্বন, একমাত্র অপেক্ষা।
পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে তাঁর আকুল প্রার্থনা—আল্লাহ যেন তাঁর মরহুম বাবা-মাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন, তাঁদের কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করে দেন, সকল গুনাহ ক্ষমা করে অসীম রহমতের ছায়ায় স্থান দেন এবং তাঁদের সঙ্গে জান্নাতে পুনর্মিলনের তাওফিক দান করেন।