ফল আমদানির বৈধ ঘোষণার আড়ালে হংকং থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। সম্প্রতি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে একটি ফলের চালান থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হওয়ার পর তদন্তে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য।
তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, কার্গো ভিলেজে বড় আকারের স্ক্যানার না থাকায় এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ফলের চালানের ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি গোপন প্রকোষ্ঠে স্বর্ণবার লুকিয়ে দেশে আনছিল। কাগজপত্রে তাজা ফলের ঘোষণা থাকায় চালানগুলো সহজেই বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে খালাস হয়ে যেত।
তদন্তে দেখা গেছে, একই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে গত এক বছরে হংকং থেকে অন্তত ১০টি ফলের চালান বাংলাদেশে এসেছে। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এসব চালানের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ কেজি স্বর্ণ দেশে আনা হয়ে থাকতে পারে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
এদিকে তদন্তে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানা ভুয়া বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেলেও চালান খালাসে যুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে মামলায় আসামি না করায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত পাঁচটি সন্দেহজনক চালানের তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, হংকং-শাহজালাল রুটকে স্বর্ণ চোরাচালানের নতুন করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কার্গো ভিলেজে বড় স্ক্যানার না থাকায় প্রতিটি চালান শতভাগ পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে বিষয়টি পুলিশি তদন্তাধীন।
বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম বলেন, তদন্ত গুছিয়ে আনা হয়েছে। আমদানিকারকের ঠিকানায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। কাগজ অনুযায়ী অফিসের অস্তিত্বই নেই। এ প্রতিষ্ঠানে নামে যত চালান হংকং থেকে এসেছে তার কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। দ্রুত একটি ফল পাওয়া যাবে।
গোয়েন্দা সংস্থা ও শুল্ক বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, ফুড লিংক নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে হংকং থেকে নিয়মিত ফল আমদানি করা হতো। সম্প্রতি একটি চালান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা খোলা হয়। পরে ফলের ক্যারেটের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় ১৬ কেজি। একই সপ্তাহে আরও একটি চালান আনা হয় এবং তা নিরাপদে খালাস করা হয়। উদ্ধার হওয়া চালানটি কেবল একটি নমুনা। এর পেছনে রয়েছে আরও বড় চোরাচালান নেটওয়ার্ক।
তদন্তকারীদের ধারণা, প্রতিটি চালানে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। ফলের ক্যারেটের ভেতরে গোপন প্রকোষ্ঠে স্বর্ণের বার লুকিয়ে আনা হতো। কাগজপত্রেও কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। ফলে চালানগুলো সহজেই কার্গো ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে খালাসের পর্যায়ে পৌঁছে যেত। তবে বিমানবন্দরে কর্মরত বেশ কিছু কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
শুল্ক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সূত্র জানিয়েছে, হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজসহ বিভিন্ন কার্গো ফ্লাইটে এসব চালান ঢাকায় আসে। আন্তর্জাতিক কার্গো ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে বৈধ ফল আমদানির আড়ালে স্বর্ণ পাচারের এই রুট ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা। উদ্ধার হওয়া চালানের নথি অনুযায়ী, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল ফুড লিংক। এয়ারওয়ে বিল নম্বর ১৬০-১২৭৪০০৯২। চালান খালাসের জন্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে ট্যাগ করা ছিল এ. রাজ্জাক ট্রেডিং নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠান। মাস্টার কার্গো এজেন্ট ছিল ফাস্টট্র্যাক কার্গো সলিউশনস লিমিটেড। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড।
এজেন্ট প্রতিষ্ঠান এ. রাজ্জাক ট্রেডিং কিংবা এর স্বত্বাধিকারীকে আসামি করা হয়নি।অন্যদিকে ফুড লিংকের উত্তর খানের মাণ্ডা অফিসে গিয়ে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ঠিকানা স্থলে একটি টিনশেড ঘর রয়েছে। তার স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম মোস্তফাও পলাতক এবং ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এ. রাজ্জাক ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আবদুর রাজ্জাক মৃধাও পলাতক এবং তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ রয়েছে।