PriyoKhobor-PNG
শুক্রবার, ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, রাত ১১:৩২
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আবহাওয়া
  6. কৃষি
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চাকরি
  10. জাতীয়
  11. ট্যুরিজম
  12. দেশজুড়ে
  13. ধর্ম
  14. নির্বাচন
  15. প্রবাসের খবর

মুষ্টির চাল থেকে দেশের শীর্ষ এনজিও: টিএমএসএসের উত্থানের পেছনে ড. হোসনে আরা বেগমের সংগ্রামী পথচলা

দৈনিক গণআওয়াজ
জুন ২২, ২০২৬ ১:২২ অপরাহ্ণ
| 90
Link Copied!

‎এম,এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ

একসময় ভিক্ষুক নারীদের মুষ্টিভর্তি চালের সঞ্চয়ে শুরু হয়েছিল একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ। সেই উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএসে। বগুড়ার প্রত্যন্ত ঠেঙ্গামারা গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, স্বপ্ন এবং একজন দূরদর্শী নারীর দৃঢ় নেতৃত্ব।

‎সম্প্রতি টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা, বিকাশ, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা দিক তুলে ধরেন।

‎যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা থেকে নতুন সূচনা

‎১৯৬৪ সালে বগুড়া সদরের গোকুল ইউনিয়নের ঠেঙ্গামারা গ্রামে ফাতেমা নামের এক নারী ভিক্ষুকের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ’। তখন গোকুল হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন হোসনে আরা বেগম।

‎শুরুতে কারিতাসের সহায়তায় সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সদস্যরা ছিলেন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও দরিদ্র নারী- ভিক্ষুক, দিনমজুর ও গৃহকর্মীরা। একটি ছোট মাটির ঘরে চলত সংগঠনের কার্যক্রম। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ঘরটি ধ্বংস হয়ে গেলে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

‎চালের সঞ্চয় থেকে আর্থিক ভিত্তি

‎১৯৮০ সালে সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হোসনে আরা বেগম। তখন সংগঠনের সম্পদ বলতে ছিল একটি মাটির ঘর, কিছু নথিপত্র, ২৫টি ড্রাম, ২০৬ মণ চাল এবং ১২৬ জন নারী ভিক্ষুক সদস্য।

‎প্রতি মঙ্গলবার সদস্যরা ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যান্য কাজ বন্ধ রেখে সভায় অংশ নিতেন। প্রথম সভায় প্রায় ৫০০ নারী উপস্থিত হলেও পরবর্তীতে ৩৩৬ জন সদস্যকে নিয়ে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।

‎সদস্যদের জমা দেওয়া চালের মান নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চালের পরিবর্তে প্রত্যেকে প্রতি সপ্তাহে নগদ দুই টাকা করে সঞ্চয় করতে শুরু করেন। ড. হোসনে আরা বেগমের ভাষায়, “এই দুই টাকার সঞ্চয়ই পরবর্তীতে টিএমএসএসের আর্থিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”

‎শ্রমনির্ভর উদ্যোগে গড়ে ওঠে নিজস্ব মূলধন

‎১৯৮২-৮৩ সালের দিকে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আসতে শুরু করে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে ইউনিসেফ ৫০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করে। পাশাপাশি স্যানিটেশন সামগ্রী তৈরির জন্য রিং ও স্ল্যাব নির্মাণের ছাঁচ সরবরাহ করা হয়।

‎সংস্থার সদস্যরা নদী থেকে বালু সংগ্রহ এবং রাস্তার পাশ থেকে খোয়া কুড়িয়ে এনে রিং ও ল্যাট্রিন তৈরি করতেন। টিএমএসএস শুধু সিমেন্ট সরবরাহ করত। এই উদ্যোগ থেকে ধীরে ধীরে প্রায় ২৭ লাখ টাকার নিজস্ব মূলধন গড়ে ওঠে।

‎ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, “গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার একটি ক্ষেত্র আমি খুঁজছিলাম। এই প্রতিষ্ঠানটিই আমাকে সেই সুযোগ করে দেয়।”

‎সরকারি চাকরি ছেড়ে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ

‎রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বিশিষ্ট সাহিত্যিক রোমেনা আফাজের অনুপ্রেরণায় সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হন হোসনে আরা বেগম। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুপারিশে তিনি বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

‎নিরাপদ সরকারি চাকরি ও নিয়মিত আয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। দরিদ্র মানুষের আইনি সহায়তা, হাসপাতালে নিরক্ষর রোগীদের সহযোগিতা – এসব কাজ তিনি নিয়মিত করতেন।

‎পরবর্তীতে ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের সদস্যদের অনুরোধে তিনি সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত করেন। ২০০৮ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন।

‎সংকট থেকে প্রেরণা

‎ড. হোসনে আরা বেগম জানান, জীবনের এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর শারীরিক জটিলতার মুখোমুখি হন। বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে জীবনের অবশিষ্ট সময় মানবকল্যাণে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, সেই মানসিক দৃঢ়তাই পরবর্তীতে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

‎ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে বিতর্ক ও ব্যাখ্যা

‎দেশের অন্যান্য মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মতো টিএমএসএসও ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নিয়ে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।

‎এ বিষয়ে ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার সরকারি নীতিমালার আওতায় নির্ধারিত হয় এবং এর পেছনে গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হয়। তিনি জানান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের কারণে পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এই খাতে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়।

‎শুধু ঋণ নয়, সামাজিক সহায়তারও কেন্দ্র

‎ড. হোসনে আরার দাবি, টিএমএসএস কেবল ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সামাজিক সহায়তা কাঠামোও।

‎বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংস্থাটির প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির সদস্যরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে একে অপরের পাশে দাঁড়ান।

‎তিনি জানান, বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ খাতে সংস্থাটির প্রায় ৫০০ কোটি টাকা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরও প্রায় ১৫০ কোটি টাকা মাঠপর্যায়ে বকেয়া রয়েছে।

‎বকেয়া ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ

‎বকেয়া অর্থ আদায় কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করতে টিএমএসএস ‘ডিউ কন্ট্রোল ডোমেইন (ডিসিডি)’ নামে নতুন একটি বিভাগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আগামী জুলাই থেকে বিভাগটি মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছেন ড. হোসনে আরা বেগম।

‎সংগ্রাম থেকে সাফল্যের প্রতীক

‎একটি মাটির ঘর, কয়েকজন ভিক্ষুক নারী এবং মুষ্টিভর্তি চালের সঞ্চয় – এই সামান্য সম্পদ নিয়েই শুরু হয়েছিল টিএমএসএসের যাত্রা। ছয় দশকের বেশি সময় পর প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রঋণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

‎টিএমএসএসের এই পথচলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিকাশের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের তৃণমূল নারীদের আত্মমর্যাদা অর্জন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং একজন দূরদর্শী নারীর অদম্য নেতৃত্বের অনন্য দলিল।

আরও পড়ুনঃ  যশোরের মুজিব বাহিনীর প্রধান আলী হোসেন মনি মারা গেছেন
আজকের সর্বশেষ সবখবর
  • BD IT HOST

  • আপনার এলাকার খবর খুঁজুন

    খুঁজুন
  • Design & Developed by: BD IT HOST