বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আজও এক অনন্য প্রাসঙ্গিক নাম। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; ছিলেন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদ ও ন্যায়ের প্রতীক। তার পুরো রাজনৈতিক জীবন ছিল বৈষম্য, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস।
ভাসানীর রাজনীতির মূল দর্শন ছিল “মজলুমের রাজনীতি”। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে ক্ষমতার দখল নয়; বরং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মজুর ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। তার বিখ্যাত আহ্বান— “মজলুম জনতা এক হও” আজও নিপীড়িত মানুষের প্রেরণা হয়ে আছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন আপসহীন। ভাসানী মনে করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে যখন সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে। তিনি শোষণমুক্ত, স্বনির্ভর ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। তার মতে, ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়তে থাকলে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নষ্ট হয়ে যায়।
ধর্ম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক। তিনি ইসলামকে দেখেছেন সাম্য, ইনসাফ ও মানবমুক্তির ধর্ম হিসেবে। ধর্মকে কখনো বিভাজনের হাতিয়ার নয়; বরং মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়ের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
সাম্রাজ্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন দৃঢ় অবস্থানে। ফারাক্কা লংমার্চ ছিল তার নেতৃত্বে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার এক ঐতিহাসিক আন্দোলন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণের ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভাসানীর চিন্তাধারা নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজ যখন সমাজে বৈষম্য, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ছে, তখন তার আদর্শ আমাদের ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথ দেখাতে পারে।
ভাসানী আমাদের শিখিয়েছেন— রাজনীতি মানে জনগণের সেবা, মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। তার স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না, সবাই সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই আজকের প্রজন্মের বড় দায়িত্ব।