গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাধখলা পূর্বপাড়া। স্থানীয়ভাবে ‘রিফুজি পাড়া’ নামে পরিচিত এই এলাকাটি এখন মাদক কারবারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী অবস্থান, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ও বিচ্ছিন্ন বসতিকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এখানে মাদক কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।গাজীপুর সদর উপজেলার সিংড়াতুলী বাজার ও সিংড়াতুলী বিট কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত মাধখলা পূর্বপাড়ার কয়েকটি স্থানে সকাল থেকে সন্ধ্যা ও রাত পর্যন্ত মাদকসেবী ও ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যায় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে এলাকায় মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে।স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও সরেজমিন অনুসন্ধানে মাদক কারবারের সঙ্গে শিপু ওরফে ‘ঘরজামাই শিপু’র নাম বারবার সামনে এসেছে। স্থানীয় নজরুলের মেয়ে সাজেদাকে বিয়ে করে ওই এলাকায় বসবাস শুরু করার পর শিপুর প্রভাব বাড়তে থাকে বলে স্থানীয়দের দাবি।তারা জানান, শিপু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একজন মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে মাদক কারবার, সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকায় এলাকার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। মাদকের প্রভাব থেকে নিজেদের সন্তানদের দূরে রাখতে গিয়ে অনেক পরিবারকেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।শিপুর বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও এলাকায় বলে জানা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক এনে মাধখলা পূর্বপাড়াকে কেন্দ্র করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে ব্যবহার করে মাদক সরবরাহের একটি চক্রও সক্রিয় রয়েছে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।মাধখলা পূর্বপাড়ায় মাদক কারবারের সঙ্গে কিশোরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, অল্প বয়সী কয়েকজনকে মাদক পরিবহন, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদককে কেন্দ্র করে এলাকায় কিশোরদের একটি দলও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, মাদক সরবরাহ এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের কাজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে কিশোরদের মাদক কারবারে যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে এলাকায় অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা জানান, শিপু এই এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা করে যাচ্ছে। যার ফলে মাদক বিস্তারের সঙ্গে এলাকায় পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। মাদক সেবন বা মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং আসবাবপত্রে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।আরেক বাসিন্দা তিনিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিছুদিন আগে এক কিশোর তার বাবাকে দা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সন্তানকে আটক করে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।স্থানীয় একাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্তানদের মাদক সেবন কিংবা মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে বাধা দিতে গিয়ে অনেক মা-বাবাকেই হামলা ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। এতে কয়েকদিন থেমে থাকলেও সংঘবদ্ধ হয়ে পুনরায় মাদক বেচাকেনা শুরু করে তারা।স্থানীয়দের দাবি, শিপুর বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কয়েক দফা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও যেতে হয়েছে তাকে। তবে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আবারও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে সে। তাই প্রত্যেক মাদক ব্যবসায়ী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের উপর নজরদারি বাড়ানো দরকার।এ ছাড়া ওই এলাকায় মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে হয়রানি, হামলা কিংবা ভয়ভীতির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় মাদক কারবার সম্পর্কে জানলেও সরাসরি প্রতিবাদ করতে সাহস পান না স্থানীয়রা। ফলে এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও দুর্বল হয়ে পড়েছে।এ বিষয়ে শিপুর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।মাধখলা পূর্বপাড়ার ভৌগোলিক অবস্থান মাদক কারবারিদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একদিকে শ্রীপুর পৌরসভা, অন্যদিকে গাজীপুর সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা। এর সঙ্গে রয়েছে বিচ্ছিন্ন বসতি ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারিরা দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু মাদক বহনকারী কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং স্থানীয়ভাবে যারা এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে—তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান এবং নিয়মিত নজরদারি ছাড়া মাধখলা পূর্বপাড়ার মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে মনে করছেন সচেতন বাসিন্দারা।স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাধখলা পূর্বপাড়ার মাদক পরিস্থিতি এখন শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়; এর ফলে আশপাশের কয়েকটি এলাকার কিশোর ও তরুণদের মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়তে পারে। ফলে কিশোর ও তরুণদের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মাদকের এই জাল আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
গাজীপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম মিঠুন জানান, তাঁরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছেন। এর আগেও মাধখলা এলাকায় কয়েকবার মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে। শিপুর বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।