বগুড়ার ধুনট উপজেলায় চুরির ঘটনা যেন কিছুতেই থামছে না। গত দুই মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট, বসতবাড়ি, খামার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২১টি চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একের পর এক চুরির ঘটনায় ব্যবসায়ী, খামারি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে গবাদিপশু চুরির ঘটনায় অনেক খামারি ও গ্রামবাসীকে রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, ধারাবাহিক এসব ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তবে ধুনট বাজারের ‘মাসুদ টেলিকমে’ চুরির ঘটনায় পুলিশের দ্রুত অভিযান এবং আন্তঃজেলা চোরচক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। তাদের মতে, একটি ঘটনায় দ্রুত সাফল্য এলেও অন্যান্য চুরির ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং চোরাই মালামাল উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।সর্বশেষ মিলন স্টোরে চুরি – সর্বশেষ গত বুধবার দিবাগত রাতে ধুনট পৌর এলাকার হাসপাতাল রোডের ‘মেসার্স মিলন স্টোরে’ চুরির ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালে দোকানের মালিক ও স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পারেন।স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, চোরেরা দোকানের পেছনের টিনের চাল এবং পাশের একটি চায়ের দোকানের পকেট দরজা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে দোকান থেকে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্কও নিয়ে যায়। এতে দোকানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে আশপাশের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।এর আগের দিন গত বুধবার সকালে ধুনট বাজারের ইছামতি মার্কেটের ‘মাসুদ টেলিকমে’ চুরির ঘটনা ঘটে। ওই দোকান থেকে ৯৪টি মোবাইল ফোন চুরি হওয়ার কথা জানানো হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে আন্তঃজেলা চোরচক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে চোরাই মোবাইল উদ্ধারের কথা জানায়।একের পর এক চুরিতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারি-ব্যবসায়ীরা- স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট গোপালপুর খাদুলী চারমাথা এলাকায় গোলাম মোস্তফার গোয়াল থেকে সাত মাসের একটি গাভিন গরু চুরি হয়। ১০ আগস্ট চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ফড়িংহাটা জামে মসজিদের গ্রিল কেটে মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে যায় চোরেরা।১১ আগস্ট ধুনট পাইলট স্কুল মার্কেটে চুরির চেষ্টা হয়। একই দিনে ফড়িংহাটা গ্রামে ছাগল চুরির সময় একজনকে আটক করে পুলিশে দেন স্থানীয়রা।৯ আগস্ট গোবিন্দপুর বাজারে ইউসুফ স্টোরের টিনের বেড়া কেটে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার মালপত্র ও নগদ টাকা চুরির অভিযোগ ওঠে। ১৬ আগস্ট উজ্জ্বল সিং গ্রামের মধ্যপাড়ায় একটি দোকানের টিনের চাল কেটে নগদ দুই লাখ টাকাসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।এ ছাড়া ২০ আগস্ট নিমগাছি গ্রামের রাজিবুল হক রিজুর বাড়িতে সিঁধ কেটে স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। ৩০ আগস্ট মথুরাপুর ইউনিয়নের কাশিয়াহাটা গ্রামে অস্ত্র প্রদর্শন করে চারটি গরু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।গত ২১ সেপ্টেম্বর মথুরাপুর ইউনিয়নের খাদুলী দ্বিগর গ্রামে একটি খাসি ও তিনটি গরু চুরির ঘটনা ঘটে। একই দিনে ধুনট থানার কাছাকাছি এলাকা থেকে অটোচালক জয়ের অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া ১৯ ও ২৪ সেপ্টেম্বর অটোভ্যান ও ব্যাটারি চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।রাত জেগে গোয়াল পাহারা – ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গবাদিপশুর মালিকদের মধ্যে। অনেক খামারি ও গৃহস্থ এখন নিয়মিত রাত জেগে গোয়ালঘর পাহারা দিচ্ছেন। কেউ কেউ পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। একই সঙ্গে দোকানপাটের নিরাপত্তা নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, ‘মাসুদ টেলিকমে’ চুরির ঘটনায় পুলিশের দ্রুত অভিযান ও গ্রেপ্তার প্রমাণ করে, কার্যকর তৎপরতা থাকলে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব। তাই অন্যান্য চুরির ঘটনাগুলোর তদন্তেও একই ধরনের তৎপরতা চান তারা। পাশাপাশি চোরাই মালামাল উদ্ধার এবং চক্রের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
ধুনট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার চুরির ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মোবাইল চুরির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে চোরাই মোবাইল উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তিনি আরও বলেন, অন্যান্য চুরির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে এখন দ্রুত তদন্ত, চোরাই মালামাল উদ্ধার এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দিকেই নজর সাধারণ মানুষের।