পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন টোটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন সেলিম। প্রথম দেখায় তাঁকে আর দশজন সাধারণ টোটোচালকের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর টোটোতে উঠলেই বদলে যায় সেই ধারণা—কারণ মানুষের প্রতি তাঁর মমতা ও সহমর্মিতার গল্পটি সত্যিই আলাদা।গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অনেক যাত্রী যখন ভাড়া দিতে চান, তখন সেলিম সেই টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মা তাঁর টোটোতে উঠলে তাঁদের কাছ থেকে ভাড়া নিতে চান না তিনি। কেউ টাকা দিতে চাইলে তাঁর অনুরোধ—“আমাকে টাকা দেবেন না, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।”নিজের সীমিত আয়ের মধ্যেও মানুষের পাশে-সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন টোটো চালান সেলিম। এই টোটোই তাঁর পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস। অথচ সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি অন্য মানুষের জন্য সময় ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন নীরবে।শুধু বয়স্ক মানুষই নন, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের প্রতিও তাঁর রয়েছে বিশেষ মমতা। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো শিশু স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে কিংবা সময়মতো যানবাহন না পেলে সেলিম নিজের টোটোতে তাকে তুলে নেন। স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার পরও অনেক সময় কোনো ভাড়া নেন না।
বরং শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন—“মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, স্যার-ম্যাডামের কথা শুনবে, ভালো মানুষ হবে।”একজন টোটোচালকের কাছে হয়তো এসব কাজ খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু যে মানুষটিকে প্রতিদিন নিজের সংসার চালাতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, তাঁর কাছ থেকে বিনা পারিশ্রমিকে এমন সহযোগিতা পাওয়া অনেকের কাছেই বড় মানবিকতার উদাহরণ।
অর্থ নয়, মানবতাই তাঁর কাছে বড়-সেলিমের নেই দামি গাড়ি, নেই বড় কোনো পরিচয় কিংবা বিপুল সম্পদ। তাঁর সম্বল একটি টোটো, পরিশ্রমী দুটো হাত এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা।তিনি সাহায্যের বিনিময়ে অর্থ, প্রশংসা কিংবা পরিচিতি—কিছুই চান না। তাঁর চাওয়া শুধু একটাই—মানুষ যেন তাঁর জন্য দোয়া করে।বহরমপুরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য টোটো চলাচল করে। তবে সেলিমের টোটো যেন শুধু যাত্রী বহন করে না; বহন করে মানুষের প্রতি মমতা, সহমর্মিতা ও মানবতার এক নীরব বার্তা।সমাজে অনেক ভালো কাজই প্রচারের আলোয় আসে না। সেলিমের মতো মানুষের ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগও হয়তো তেমনই নীরবে থেকে যায়। কিন্তু এই নীরব কাজগুলোই মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে।সেলিম হয়তো বড়লোক নন, বিখ্যাতও নন। কিন্তু মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে বড় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না—প্রয়োজন হয় একটি বড় হৃদয়ের।