কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্মস্থলে যোগদান কিংবা বিদায় উপলক্ষে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। তবে সাংবাদিকতার সার্বজনীন নীতি ও পেশাদারিত্বের মানদণ্ডে এমন চর্চা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কুড়িগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় এ ধরনের ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যেই আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪-এর আওতায় সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার পেশাগত মানদণ্ড রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রণীত ‘সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় আচরণবিধি, ১৯৯৩ (২০০২ সালে সংশোধিত)’ সাংবাদিকদের পেশাগত আচরণের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়।আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, সাংবাদিকের ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও প্রশ্নকর্তার। সরকারি কর্মকর্তাকে ফুল দিয়ে বরণ বা বিদায় জানানোর মাধ্যমে গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে অনভিপ্রেত ঘনিষ্ঠতার বার্তা তৈরি হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে পরবর্তীতে বস্তুনিষ্ঠ ও পক্ষপাতহীন সংবাদ পরিবেশনে পেশাগত সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। ক্ষমতাশীলদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা বা Watchdog role পালন করা গণমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিয়মিত সংবর্ধনা দেওয়া সেই স্বাধীন নজরদারির অবস্থানকে দুর্বল করে গণমাধ্যমকে প্রশাসনের প্রশংসাকারী হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদসূত্রের সঙ্গে পেশাগত দূরত্ব বজায় রাখা সাংবাদিকতার অন্যতম শর্ত। কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ সুবিধা কিংবা সহজে তথ্য পাওয়ার প্রত্যাশায় ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ দেখা দিতে পারে। ফুলেল শুভেচ্ছা বা সংবর্ধনার মাধ্যমে সাংবাদিক ও কর্মকর্তার মধ্যকার পেশাগত সীমারেখাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।অনেক সময় অসাধু বা বিতর্কিত কর্মকর্তারা স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংবর্ধনা নিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করতে পারেন। এতে সাধারণ মানুষের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সৎ ও গণমাধ্যমের সমর্থনপুষ্ট—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে, যা প্রশাসনিক অনিয়ম আড়াল করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।অন্যদিকে, সাংবাদিকদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার প্রতি অতিরিক্ত অনুগত আচরণ সাধারণ পাঠক ও দর্শকদের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও তথ্যের সততা নিয়ে সংশয় তৈরি করতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তবে সরকারি কর্মকর্তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা বা সংবর্ধনা দেওয়াকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেছে—এমন নির্দিষ্ট আইন বা বিধানের উল্লেখ নেই। বিষয়টি মূলত সাংবাদিকতার পেশাগত আচরণ, নিরপেক্ষতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং সংবাদসূত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখার নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো সৌজন্যমূলক অভ্যর্থনার আয়োজন করে থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পেশাদারিত্ব বজায় রাখা ও গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখতে এ ধরনের চর্চা নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সম্পর্ক হওয়া উচিত পেশাগত দূরত্ব, সততা, জবাবদিহিতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে—সংবর্ধনার নয়।