যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ২নং মাগুরা ইউনিয়নের জয়রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর সবুরের বিরুদ্ধে একাধিক কোমলমতি ছাত্রীকে চুম্বন, শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়া এবং বিষয়টি কাউকে জানালে হত্যার হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থলে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওয়ালীয়ার রহমান জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে| অভিযুক্ত আব্দুর সবুর পৌরসভার কাটাখাল গ্রামের আব্দুর গফুরের ছেলে। চাকরিজীবনের শুরু ২২ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে কাটাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।পরে ২০১৭ সালে খাটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করে একই বছরের ৫ এপ্রিল বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর ১৫ মে ২০১৮ সালে ডেপুটেশনে এবং ৩ মার্চ ২০২০ সালে স্থায়ী বদলির মাধ্যমে জয়রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। আগামী ১৬ নভেম্বর ২০২৯ সালে তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, অভিভাবক এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের চিলেকোঠা, ফাঁকা শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন স্থানে সুযোগ বুঝে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির একাধিক ছাত্রীকে একান্তে ডেকে নিয়ে চুম্বন ও শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতেন অভিযুক্ত শিক্ষক। শিশুদের অভিযোগ, এসব ঘটনা কাউকে জানালে তাদের হত্যা করে এমন স্থানে লাশ ফেলে দেওয়া হবে, যেখানে কেউ খুঁজেও পাবে না এমন ভয়ভীতি দেখানো হতো। ভয়, লজ্জা ও আতঙ্কের কারণে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন বিষয়টি গোপন রাখলেও সম্প্রতি কয়েকজন ছাত্রী পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত শিক্ষক গত ২৮ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত স্ত্রীর চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে তিন দিনের ˆনমিত্তিক ছুটি নেন। এরপর ৩০ জুন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে আরও ১৫ দিনের চিকিৎসাজনিত ছুটির আবেদন করেন।
শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন পরবর্তীতে গত ১৬ জুলাই থেকে তিনি আবারও বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত হতে শুরু করেন।
ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, “স্যার আমাদের চুমু খেতেন, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতেন। কাউকে বললে তুলে নিয়ে হত্যা করা হবে, লাশও কেউ খুঁজে পাবে না এমন ভয় দেখাতেন।”
স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, বিদ্যালয় এমন একটি জায়গা যেখানে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকার কথা| অথচ এমন অভিযোগের পর অনেক পরিবার সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, তদন্তে কোনো ধরনের প্রভাব বা গাফিলতি হলে প্রকৃত বিচার বাধাগ্রস্ত হবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আব্দুর সবুর অতীতে কাটাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালেও একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন। যদিও সে সময় বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে সরকারি নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুর সবুর বলেন, “আমি আদর করে চুমু খেয়েছিলাম। আমার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা ষড়যন্ত্র করছেন।” অতীতে কাটাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, “সেই সময়ও আমি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলাম।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওয়ালীয়ার রহমান বলেন, “গত ২ জুলাই লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর ৭ জুলাই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আমাকে প্রতিবেদন দিয়েছে এবং আমি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে প্রতিবেদন সহ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠিয়েছি। আমার জানা মতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।” তিনি আরও জানান, অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় কয়েকজন অভিযোগকারী অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন। তবে আবেদনটি যথাযথ না হওয়ায় তা গ্রহণ করা হয়নি।
এদিকে অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার পরও অভিযুক্ত শিক্ষককে বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাওয়ায় অভিভাবক ও সচেতন মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কীভাবে একজন অভিযুক্ত শিক্ষক একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন ?
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারে পাঠানোর পর অভিযুক্ত শিক্ষক নিজের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ ও তদবির করছেন। এছাড়া সংবাদ প্রকাশ বন্ধ বা প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং কিছু সংবাদকর্মী সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর অভিযোগও উঠেছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত শিক্ষককে অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশুর জন্য বিদ্যালয় হবে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ভয়, আতঙ্ক কিংবা নিপীড়নের জায়গা নয়। তাই এই ঘটনার দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক নিষ্পত্তিই এখন সময়ের দাবি।