কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রির সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে এক সাংবাদিককে মারধর, হত্যাচেষ্টা ও নগদ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা সদর ইউনিয়নের নলেয়া গ্রামের হায়দার আলীর পুত্র মাংস ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক (৩৫) ও তার ভাই মোঃ মাসুদ রানা মুন্না (২৮) এবং মৃত অবর উদ্দিন এর পুত্র মোঃ সাইফুর রহমান (৪২) এর বিরুদ্ধে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাদ্দাম মোড়ের পূর্ব পার্শ্বে আমিনুর মেম্বারের বাড়ির সামনে। এ ঘটনায় আহত সাংবাদিকের মা বাদী হয়ে ভূরুঙ্গামারী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তদন্ত সাপেক্ষে পুলিশ মাসুদ রানা মুন্নাকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করেছে।
সাংবাদিক মাইদুল মাস্টার্স ও এল এল বি পড়ালেখা শেষ করে দীর্ঘদিন থেকে উপজেলার সমস্যা, সম্ভাবনা, সচেতনতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সুনামের সাথে অগ্রযাত্রা প্রতিদিন, তালাশ বিডি, দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় কর্মরত থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে এবং কুড়িগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন সদস্য।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ইং ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস কর্তৃক বাজারে অভিযান পরিচালনা করে অসুস্থ গরুর মাংস বিক্রি বন্ধ করে এবং জব্দকৃত মাংস মাটিচাপা দেয়। জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ওই ঘটনাটি বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সাংবাদিক মাইদুল ইসলামও সংবাদ প্রকাশ করেন।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই মাংস ব্যবসায়ী মোজাম্মেল মাইদুলের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ফোনে হুমকি দিলে বিষয়টি সচেতন ব্যবসায়ীরা ঝামেলা করতে বাধানিষেধ করলেও মোজাম্মেল বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ গরু জবাই নিউজের বিষয়ে কথা বলে আসছিলো। সর্বশেষ গত ২০ মে ২০২৬ রাতে সাংবাদিক মাইদুলকে মেসেঞ্জারে ফোন করে সংবাদ প্রকাশের কারণে ক্ষতির কথা উল্লেখ করে। সাংবাদিক মাইদুল ৪ জুন বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলযোগে ব্যবসায়ীক কাজে ভূরুঙ্গামারী বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে সাদ্দাম মোড়ের পূর্ব পার্শ্বে আমিনুর মেম্বারের বাড়ির সামনে পৌঁছালে মোজাম্মেলের ছোট ভাই মাসুদ রানা মুন্না হাতুড়ি নিয়ে তার পথরোধ করে এবং মোজাম্মেলকে ফোন করলে বলে সে না আসা পর্যন্ত ছাড়তে নিষেধ করে। কিছুক্ষণ পর মোজাম্মেল ও সাইফুর বাজার থেকে ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিককে অসুস্থ গরু জবাইয়ের সংবাদ প্রকাশের কথা বলেই প্রথমে মোজাম্মেল ও সাইফুর পরে মুন্নাসহ তিনজন সাংবাদিক মাইদুকে মেরে ফেলার উদ্যেশে এলোপাতাড়িভাবে মাথায়, মুখে, কানে, বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল ঘুষি মেরে আহত করে। হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরেন, সাংবাদিকের পকেটে থাকা নগদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয় দোকানদার ও পথচারীরা এগিয়ে এসে হামলাকারীদের নিকট থেকে তাকে ছাড়ালেও একপর্যায়ে মোজাম্মেল হাতে ধারালো কিছু দ্বারা সাংবাদিককে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে এতে নাকের হাড় ভেঙে গুরুতর রক্তাক্ত হয়ে ও পড়নের শার্ট ও প্যান্ট রক্ত দিয়ে ভিজে যায়। স্থানীয়রা পরিবারের সদস্যদের খবর দেয় এবং উদ্ধার করে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। সেখানে ৪ দিন চিকিৎসা নিলেও নাকের হাড় ভাঙ্গা ও কানের পর্দা ফেটে অঙ্গহানি হওয়ায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে এবং সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অভিযোগ বিষয়ে অভিযুক্ত মোজাম্মেল বলেন, অসুস্থ গরু তিনি জবাই করেনি। অভিযান হলে মাইদুল এ বিষয়ে নিউজ করে, পরে তাকে অনেকবার ডাকা হলে দুইতিনজন সাংবাদিকসহ বাজারে আসে ও কথা হয়। ঘটনার দিন সাড়ে নয়টার দিকে বাজার থেকে ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিককে মারপিটের ঘটনায় রক্তাক্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হয় বলে জানায়।
সাংবাদিক হাসপাতালে ভর্তি থাকাবস্থায় অভিযুক্ত মুন্না ৬ জুন (বুধবার) আনুমানিক রাত ১১টার দিকে শফিকুল এর ছেলে রাকিব ও মোটরসাইকেল মেকার সুলতানকে সাথে নিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ কথা বলেন এবং বলেন, প্রায় দুই মাস আগে আমার ফেসবুকে ছবি পোস্ট করলে মাইদুল ভাই ছবিটির ইমোজি সরিয়ে কমেন্ট শুধু ছবি দিয়েছিলো এবং ফোন করলে সাথে সাথে ডিলিট করে দেয়। এ নিয়ে দুইমাস আগে কথা হয়েছিল। তবে ঘটনার দিন আমার মেজাজ ভালো ছিলোনা। ভাইকে বাইক থামিয়ে কথা বলার ফাঁকে বড় ভাই মোজাম্মেলকে ফোন করলে ভাই বাজারে ছিলো এবং আটক করে রাখতে বলে। এখানে মারামারির কোন বিষয় ছিলো না তবে বাজার থেকে মোজাম্মেল ভাই ও সাইফুর এসেই গরু জবাইয়ের নিউজের কথা উল্লেখ করেই মাইদুল ভাইকে মারপিট শুরু করে, আমি ফাঁকে ছিলাম পরে এসে সাথে আমিও মারি। মোজাম্মেল ভাইয়ের ঘুষিতেই মাইদুল ভাইয়ের নাক ফেটে রক্তাক্ত হয়। এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে আমি বুঝতে পারি নাই। এ সময় ভর্তি রোগী মৃত ইবর উদ্দিনের ছেলে মুসলিম উপস্থিত থেকে ঘটনা শুনেন।
সাংবাদিক মাইদুল বলেন, অসুস্থ গরু জবাই করা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের মতো আমিও সংবাদ প্রকাশ করি। এরই জের ধরে আমাকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল মোজাম্মেল। মোজাম্মেল, মুন্না ও সাইফুর তিনজনে হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে, হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চিপে ধরে, নাক ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে। এক লাখ বিশ হাজার টাকা ছিনতাই করে। আমি গুরুত্বর অসুস্থ চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছি। বিষয়টি পত্রিকা অফিস ও সাংবাদিকদের জানিয়েছি তারা খোঁজখবর নিচ্ছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী সাংবাদিকের মা বলেন, “আমার ছেলে জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করে। সাংবাদিকদের যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে সাংবাদিকতা করে কি লাভ। সকল সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানো ও হামলাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।
এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে জেলার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।কুড়িগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম রিগান বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন বা সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদে কেউ সংক্ষুদ্ধ হলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকের ওপর হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত। মাঈদুলের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই। ভবিষ্যতে কেউ যেন হামলার শিকার না হয় সে জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি।
রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুজ্জামান সালেক বলেন, সাংবাদিক মাইদুলের ওপর হামলা নিন্দনীয়, উদ্বেগজনক এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি।
কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ শফি খান তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, সংবাদ প্রকাশের জেরে যদি একজন সাংবাদিককে এভাবে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়, তবে তা আমাদের সমাজের জন্য অশনি সংকেত। স্বাধীন গণমাধ্যমের কথা মুখে বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা যা জানাচ্ছি এবং জড়িতদের কঠোরতম শাস্তির দাবি করছি।
বাংলাদেশ সাংবাদিক লেখক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোঃ কুতুব উদ্দিন বলেন, “সাংবাদিকের ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, এটি সত্য ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার ওপরও আঘাত। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর বলেন, সাংবাদিক নির্যাতনকারীরা দেশ-সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। এদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ আশিকুজ্জামান বলেন, মাংস হাটে অভিযানে একটি রোগাক্রান্ত গরু জবাই করছিলো যা জব্দ করে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। এ সময় অনেকে সংবাদ প্রকাশ করে। সাংবাদিককে মারপিটের ঘটনা নিন্দনীয়। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা হয়েছে।
ভূরুঙ্গামারী থানার অফিসার ইনচার্জ আজিম উদ্দিন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে একজন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।