চারিদিকে ঈদের আমেজ। ঘরে ঘরে বইছে আনন্দের জোয়ার। রঙিন পোশাকে শিশুরা ছুটোছুটি করছে, সেমাই-পোলাওয়ের সুগন্ধে ম ম করছে চারপাশ। কিন্তু এই উৎসবের আলো পৌঁছায়নি গাজীপুরের মনিপুর গিভেন্সী গ্রুপের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের সুউচ্চ চার দেয়ালের ভেতর। সেখানে বাতাসের প্রতিটি কম্পনে মিশে আছে এক বুক হাহাকার আর পাথরচাপা কষ্ট। শতাধিক অভাগা বাবা-মায়ের কাছে ঈদ মানে আজ উৎসব নয়, বরং পুরনো স্মৃতি হাতড়ানো আর সন্তানদের ফেরার মিছে প্রতীক্ষা।
কথায় আছে, বাবা মানে মাথার ওপর তপ্ত রোদে বটবৃক্ষের শীতল ছায়া, আর মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে সেই, জান্নাত আজ অবহেলিত ঠিকানায়। ঈদের সকালে যেখানে নাতি-নাতনি আর সন্তানদের কোলাহলে ঘর মুখর থাকার কথা,সেখানে এই প্রবীণ নিবাসে বিরাজ করছে এক পিনপতন নীরবতা।নিবাসের বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছেন পরিবার থেকে বিছিন্ন বাবা মা।ঝাপসা চোখে হয়তো খুঁজছেন সেই পরিচিত মুখটি, যাকে এক সময় তিলে তিলে আগলে বড় করেছিলেন। কারো ছেলে প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার, কারো মেয়ে সুদূর প্রবাসে পেতেছে সুখের সংসার। অথচ জন্মদাতা সেই বাবা-মায়ের শেষ বয়সের ঠাঁই হয়েছে এই পরনির্ভরশীল আশ্রয়ে। তাদের এই আর্তনাদ যেন আজ আকাশ-বাতাসকেও ভারী করে তুলছে।
আবেগ আর অভিমানে সিক্ত এই প্রবীণদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে একই রুটিনে। কিন্তু ঈদ এলে হৃদয়ের ক্ষতগুলো যেন আরও দগদগে হয়ে ওঠে। পরিবারের সাথে কাটানো ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করে অনেকেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তাদের মতে, সন্তানদের সুখের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো তারা বিসর্জন দিয়েছেন কঠোর পরিশ্রমে। আজ সেই সন্তানরা কি একবারের জন্যও তাদের এই ফেলে আসা বাবা-মায়ের কথা ভাবছে?
সন্তানরা পাশে না থাকলেও এই অবহেলিত মানুষগুলোর মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে চেষ্টার কমতি রাখেনি বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ। ঈদের বিশেষ দিনে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন রঙিন পোশাক। দুপুরের আয়োজনে ছিল সুগন্ধি পোলাও,মাংস আর দুধ-সেমাই।
মনিপুর বৃদ্ধাশ্রমের হোস্টেলের সহকারী মেডিক্যাল অফিসার বেলাল খান বলেন,আমরা পরম মমতায় তাদের সেবা করার চেষ্টা করি।নতুন পোশাকে তারা সেজেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই উজ্জ্বল রঙের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ধূসর বিষাদ।পরিবারের কষ্ট তো আর কাউকে ভুলানো সম্ভব না,তবু চেষ্টা করি তাদের একটু হাসি খুশি রাখার। এই বৃদ্ধাশ্রমের পরিবেশটা এখন একে অপরের পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছে। একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিতে নিতেই কাটছে তাদের নিঃসঙ্গ জীবন।
বয়স্ক পুন বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ষাট উর্ধ্ব পাখী বেগম জানান,দিন শেষে উৎসব ফুরাবে। কিন্তু এই বৃদ্ধাশ্রমের করিডোরে রয়ে যাবে শত শত বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস।পাখী বেগম পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষিকা।ছেলের অবহেলায় আজ তার ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।পাখী বেগমের মত শতাধক
পরিবার থেকে বিছিন্ন হয়ে আশ্রয় নিয়েছে মনিপুর হোতা পাড়া বয়স্ক পুনবাসন কেন্দ্রে।
কিশোরগঞ্জের হারুয়া থেকে বৃদ্ধাশ্রমে আসা সত্তোর ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা ইসলাম খান বলেন,কোটি টাকার সম্পদ রেখে আমি এখানে আছি। আমার দুই ছেলে আমাকে মারধর করে এজন্য বাধ্য হয়ে সবকিছু ফেলে চলে এসেছি। আজকের দিনে আমার কারো কথা মনে পড়ছে না। কিন্তু কষ্ট আছে অনেক মনের ভেতর জমা।
যে মানুষগুলো নিজেদের জীবন বিলিয়ে আমাদের পৃথিবীর আলো দেখালেন,শেষ বয়সে তারা কেন অন্ধকারের এই নিঃসঙ্গ ঠিকানায়।
এবারের ঈদ কি আমাদের সমাজে সেই মানবিক বোধটুকু জাগিয়ে তুলবে না? আমাদের বিবেক কি প্রশ্ন করবে না,কেন উৎসবের দিনেও এই বটবৃক্ষদের চোখের জল ফেলতে হবে? প্রতিটি সন্তানের মনে রাখা উচিত, সময়ের চাকা ঘুরছে,আজকের সন্তানই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধাশ্রম যেন কোনো বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা না হয়, এই হোক এবারের ঈদের অঙ্গীকার।