ভারতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য এবং নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনছে। যদিও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রয়েছে, তবুও জনমতের ভেতরে জমে ওঠা এই অস্বস্তি নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, ভারতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, আর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে জনমতও নেতিবাচক দিকে ঝুঁকছে।গত সপ্তাহে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ভারতের প্রসঙ্গে ‘হেলহোল’ (নরকের মতো জায়গা) শব্দ ব্যবহার করে মন্তব্য শেয়ার করলে নয়াদিল্লি তা ‘অনুপযুক্ত’ বলে সমালোচনা করে। ট্রাম্প ‘দ্য স্যাভেজ নেশন’ নামের একটি টক রেডিও অনুষ্ঠানের অংশ শেয়ার করেন। সেখানে রক্ষণশীল ভাষ্যকার মাইকেল স্যাভেজ বলেন, ‘এখানে জন্মানো একটি শিশু সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক হয়ে যায়, এরপর তারা পুরো পরিবারকে চীন, ভারত বা পৃথিবীর অন্য কোনও নরকের মতো জায়গা থেকে নিয়ে আসে।’ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই মন্তব্যকে ‘স্পষ্টতই অজ্ঞতাপূর্ণ, অনুপযুক্ত এবং রুচিহীন’ বলে আখ্যা দেয়। তারা আরও জানায়, ‘এ ধরনের মন্তব্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না, যা দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।’
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিভিন্ন অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভারতের জনমতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর সময় ভারত এই সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী ছিল। কিন্তু পাঁচ মাস পরই কাশ্মীরের পেহেলগাম হামলার পর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্প নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দাবি করলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়।
পাকিস্তান ট্রাম্পের বক্তব্য সমর্থন করলেও ভারত তা জোরালোভাবে অস্বীকার করে। ভারত মনে করে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা দ্বিপাক্ষিক এবং কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের কোনও ভূমিকা গ্রহণযোগ্য নয়।
যেভাবে আস্থায় প্রভাব ফেলেছে শুল্কনীতি
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ শুল্ক। এর একটি কারণ হিসেবে ভারতের রাশিয়ার তেল কেনাকে উল্লেখ করা হয়।একই বছরের আগস্টে ‘দিল্লি পলিসি গ্রুপ’-এর এক প্রতিবেদনে সাবেক কূটনীতিক হেমন্ত কৃষ্ণ সিং বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে। তিনি লেখেন, ‘রাশিয়ার তেল কেনার কারণে শুধু ভারতকে টার্গেট করা এবং অন্য বড় ক্রেতাদের ছাড় দেয়া আসলে শত্রুতাপূর্ণ আচরণ ছাড়া আর কিছু নয়।’
তিনি আরও বলেন, এতে পারস্পরিক আস্থা কমেছে, অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং ভারতে জনসমর্থনও কমে গেছে।
গত মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইসিনা ডায়ালগে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, ‘চীনের ক্ষেত্রে যে ভুলগুলো হয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে আমরা তা পুনরাবৃত্তি করব না।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত নাভতেজ সারনা বলেন, গত এক বছরের ঘটনাগুলোর ফল হিসেবেই এসব মন্তব্য এসেছে এবং এতে দিল্লির অনেক কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উষ্ণ মনোভাবও ভারতের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা আরও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন। যেমন এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি আরও কঠোর করা, ভারত নিয়ে ‘বর্ণবাদী বয়ান’ ছড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনার ‘অস্থায়ী অনুমতি’ দেয়া।
স্বাধীন সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞ কারেন রেবেলো বলেন, ইরান যুদ্ধ ‘সবকিছু বদলে দিয়েছে’। তিনি বলেন, ‘রুপির মান রেকর্ড পরিমাণে কমেছে, শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। আমদানিনির্ভর ভারতের মানুষের জীবনে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।’
ভারতের ডানপন্থি ভোটারদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে যারা ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তারা আদর্শগত মিলের কারণে আগে ট্রাম্পকে সমর্থন করতেন। রেবেলোর মতে, ‘উভয় পক্ষই ধর্মনির্ভর, রক্ষণশীল ও বাণিজ্যপন্থি এবং মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরোধী হিসেবে দেখে।’
তবে এখন ব্যবসায় ক্ষতির কারণে সেই সমর্থন নীরব অসন্তোষে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এমনকি কিছুটা ঈর্ষাও তৈরি হয়েছে। তারা চায়, ভারতই যেন শর্ত নির্ধারণ করে।’
মিডিয়ার অবস্থান পরিবর্তন
মোদি সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে সংযত অবস্থান নিয়েছে, কারণ ট্রাম্প মাঝে মাঝে নয়াদিল্লিকে ‘খুব ভালো বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন। নাভতেজ সারনা বলেন, ‘ভারত সম্পর্কটি ধরে রাখতে চায়, যাতে সবকিছু হারিয়ে না যায়।’
তবে মোদি সরকার যেখানে সংযত, সেখানে সরকারপন্থি প্রভাবশালী ইউটিউবাররা ট্রাম্পের সমালোচনা শুরু করেছেন। নিতেশ রাজপুত, শামস শর্মা, অভি (অভি অ্যান্ড নিয়ু) এবং অভিজিৎ চাভদার মতো ইউটিউবাররা সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভালো বন্ধু’ বয়ান থেকে সরে এসে ট্রাম্পকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ভারতভিত্তিক এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যারেটিভ রিসার্চ ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুনদীপ নারওয়ানি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে’। তিনি বলেন, ইউটিউবাররা এখন জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে এবং তাদের বয়ান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি মূলধারার টিভি চ্যানেলগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে।
নারওয়ানি বলেন, ‘আগে টিভি চ্যানেলগুলো যুক্তরাষ্ট্রপন্থি ছিল, এখন কাভারেজে ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে’। তিনি জানান, ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে এখন উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি সমানভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা আগে দেখা যায়নি।
এর প্রভাব কী হতে পারে
বর্তমানে এই জনমত পরিবর্তন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বড়ভাবে প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে না, কারণ এই সম্পর্ক গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে ভেতরে ভেতরে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা উপেক্ষা করা কঠিন।
যে সম্পর্ক একসময় আশা ও ইতিবাচক মনোভাবের ওপর দাঁড়িয়েছিল, এখন তা ধীরে ধীরে খরচ, প্রভাব এবং ভারসাম্যের প্রশ্নে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অনেক ভারতীয়র কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু সহযোগী নয়, বরং এমন এক শক্তি— যার সিদ্ধান্ত তাদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ফল নয়, বরং বাস্তব অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাব মিলেই তৈরি হয়েছে। আর এটি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থায়ী হতে পারে।