বগুড়ার ধুনট উপজেলার সোনাইডাঙ্গা জলাশয়ের ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ২৫টি জেলে পরিবার। বৈধভাবে ইজারা গ্রহণ ও বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরও জলাশয় থেকে মাছ আহরণ করতে না পারায় পরিবারগুলো বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। দ্রুত আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে মাছ আহরণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে গত শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) বিকেলে সোনাইডাঙ্গা জলাশয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একমাত্র জীবিকার উৎস বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। বিষয়টির দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, গোপালনগর ইউনিয়নের ১৯ একর ৪০ শতক আয়তনের সোনাইডাঙ্গা জলাশয়টি বাংলা ১৪৩৩ থেকে ১৪৩৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য গত ১৮ ফেব্রুয়ারি গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে এক লাখ ২০ হাজার ৯০৭ টাকায় ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।
সমিতির সভাপতি অমুল্য চন্দ্র হাওয়ালদার জানান, সরকারি ইজারামূল্য পরিশোধের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে জলাশয়ে মাছ চাষ শুরু করা হয়। কিন্তু পরে গোপালনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি স্বপন হাওয়ালদার ওই ইজারা বাতিলের দাবিতে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করেন। জেলা প্রশাসক আপিলটি খারিজ করে গত ১২ মে গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জলাশয়ে নিরাপদে মাছ চাষ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে স্বপন হাওয়ালদার রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৫৯/২০২৬ নম্বর আপিল দায়ের করেন। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে গত ১১ জুন গোপালনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে আদেশ দেওয়া হলে জলাশয়ের ইজারা নিয়ে দুই সমিতির মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে এবং এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এ অবস্থায় গোপালনগর পশ্চিমপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি অমুল্য চন্দ্র হাওয়ালদার বিভাগীয় কমিশনারের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ৭৮৫৭/২০২৬ নম্বর রিট পিটিশন দায়ের করেন। আদালত বিভাগীয় কমিশনারের আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। হাইকোর্টের ওই আদেশের পর ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামী গত ১৩ জুলাই অমুল্য চন্দ্র হাওয়ালদারকে পুনরায় সোনাইডাঙ্গা জলাশয়ের ইজারা বহাল রেখে নিরাপদে মাছ চাষের জন্য চিঠি প্রদান করেন।
তবে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনন্দ হাওয়ালদার অভিযোগ করেন, ইউএনওর চিঠি পাওয়ার চার দিন পর মৌখিকভাবে তাদের মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। পাশাপাশি মাছ ধরলে মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এতে সমিতির সদস্যরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তিনি বলেন, “মাছ ধরা আমাদের একমাত্র পেশা। দীর্ঘদিন জলাশয়ে যেতে না পারায় ঋণের বোঝা বাড়ছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার এখন মানবিক সংকটে রয়েছে।”
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আদালতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে বৈধ ইজারাদারদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে এবং সাধারণ জেলে পরিবারগুলো জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, “বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। হাইকোর্ট স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। আদালতের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী সোনাইডাঙ্গা জলাশয়ের ইজারা গোপালনগর সমবায় সমিতির নামে বহাল রয়েছে। আগামী রোববার সংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রয়োজনীয় লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হবে।”