মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কায়সার হামিদের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, প্রশাসনিক অনিয়ম, সরকারি কাজে অস্বচ্ছতা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মৌলভীবাজার সফরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত সড়ক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ব্যয় ও সরকারি বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই এসব অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কাজের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ, সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মৌলভীবাজার সফর উপলক্ষে মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল মহাসড়কের দুই পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী এ ধরনের কাজের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ, অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের বিধান রয়েছে।
কিন্তু এই কাজের জন্য কত টাকা বরাদ্দ এসেছে এবং কীভাবে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে—এ বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার হামিদ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। উপস্থিত সাংবাদিকদের ভাষ্যমতে তিনি বলেন, “আরে মিয়া যান, আপনারা আমাকে বিরক্ত করছেন কেন? আমার পিছন ছাড়ছেন না কেন?”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, উক্ত কাজের জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই এবং এটি তাদের ‘নিজস্ব উদ্যোগে’ পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, সরকারি সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন সড়কে কোনো সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে ‘নিজস্ব উদ্যোগে’ শ্রমিক নিয়োগ করে কাজ পরিচালনা করেন? শ্রমিকদের পারিশ্রমিক, সরঞ্জাম ও অন্যান্য ব্যয় কোথা থেকে বহন করা হচ্ছে—সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসমূহের ঝোপঝাড় পরিষ্কার, ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রতিবছরই নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের অধিকাংশ সময় সড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ ঝোপঝাড় ও আগাছা অপসারণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
স্থানীয়দের মতে, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর বা বিশেষ কর্মসূচি সামনে এলেই তড়িঘড়ি করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
এদিকে তথ্য অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। ওয়েবসাইটে কর্মকর্তাদের তথ্য প্রদর্শনের জন্য মোট ৯ জন কর্মকর্তার ছবি ও পরিচিতি সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কায়সার হামিদের নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর প্রদর্শিত হলেও তার ছবি অনুপস্থিত দেখা গেছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, পূর্বে সেখানে তার ছবি প্রদর্শিত ছিল, যা পরবর্তীতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য উপস্থাপনের স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছর ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ যথাযথভাবে কাজে ব্যয় না করে কাগুজে বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অনিয়ম চলে আসছে এবং বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীর আচরণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। তাদের মতে, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য জনগণ ও গণমাধ্যমের কাছে জবাবদিহিতার আওতায় থাকা উচিত। তথ্য জানতে চাওয়ার কারণে সাংবাদিকদের অপমান করা এবং প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন না। আমি তার সঙ্গে কথা বলব। সাংবাদিকদেরও একটু শান্ত থাকতে বলুন।”
তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু মৌখিক আশ্বাসে বিষয়টির সমাধান হবে না। মৌলভীবাজার সওজ বিভাগের বিগত কয়েক বছরের ঝোপঝাড় পরিষ্কার, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ব্যয় হওয়া অর্থের হিসাব নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় জনগণের দাবি, অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের আর্থিক লেনদেন, বরাদ্দ ব্যয় এবং বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহের নিরীক্ষা করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি কোনো বরাদ্দ না থাকে, তবে সরকারি সড়কে চলমান কাজের অর্থায়ন কোথা থেকে হচ্ছে? আর যদি বরাদ্দ থেকে থাকে, তবে সেই তথ্য জনগণ ও গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করতে এত অনীহা কেন?