প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ৩:২৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ১:১১ অপরাহ্ণ
ধর্ম যখন মঞ্চের পণ্য, ওয়াজ শিল্প, তারকা বক্তা ও দাওয়াতের সংকট

বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় ইসলামবিদ্বেষী শক্তির কাছ থেকে আসেনি; অনেক সময় ইসলামের ক্ষতি হয়েছে ইসলামের নাম ব্যবহারকারীদের হাতেই। আজকের বাস্তবতায় ধর্মীয় অঙ্গনের একটি অংশ এমন এক প্রবণতার মধ্যে প্রবেশ করেছে, যেখানে নববী দাওয়াতের স্থানে স্থান পেয়েছে ব্যক্তিপূজা, জ্ঞানের স্থানে আবেগ, প্রজ্ঞার স্থানে উসকানি এবং আখিরাতমুখী দায়বদ্ধতার স্থানে বাজারমুখী জনপ্রিয়তা।
ওয়াজ-মাহফিল একসময় ছিল কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মানুষকে সংশোধনের ময়দান। সেখানে মানুষের ঈমান, আমল, চরিত্র ও আত্মশুদ্ধির আলোচনা হতো। আজ বহু ক্ষেত্রে সেই মঞ্চ পরিণত হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনীতে। বক্তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই হয় না তার ইলম, গবেষণা বা আমলের মাধ্যমে; বরং কত দ্রুত তিনি ভাইরাল হতে পারেন, কত জোরে কথা বলতে পারেন, কত মানুষকে আবেগতাড়িত করতে পারেন কিংবা কত বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারেন তা দিয়েই জনপ্রিয়তা মাপা হয়।
ফলে ধর্মীয় আলোচনা ক্রমেই জ্ঞানচর্চা থেকে সরে গিয়ে বিনোদননির্ভর উপস্থাপনায় রূপ নিচ্ছে। ইসলামের গভীর বোধ, ফিকহ, আকিদা, তাফসির, হাদিস ও সভ্যতার আলোচনা স্থান হারাচ্ছে আবেগনির্ভর স্লোগান, চটকদার বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণের কাছে।
পবিত্র কুরআন দাওয়াতের যে নীতি নির্ধারণ করেছে, তার সঙ্গে এই প্রবণতার বিস্তর ফারাক রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,'তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।' (সূরা আন-নাহল ১২৫)
দাওয়াতের মূল ভিত্তি ছিল হিকমাহ, জ্ঞান, ধৈর্য ও চরিত্র। অথচ বর্তমানের কিছু ধর্মীয় বক্তার বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে হেয় করা, আলেমদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ভিন্নমতকে বিদ্রূপ এবং সাধারণ মানুষকে বিভক্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এতে ইসলাম শক্তিশালী হয় না, বরং সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় নেতৃত্ব সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ দ. এর দাওয়াতি জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কখনো নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারকে দাওয়াতের লক্ষ্য বানাননি। তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন চরিত্র দিয়ে, শত্রুকেও সম্মান দিয়ে, অজ্ঞতাকে জ্ঞানের মাধ্যমে মোকাবিলা করে। তাঁর মিশন ছিল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, নিজের দিকে নয়।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ধর্মীয় অঙ্গনের একটি অংশে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে। বক্তার অনুসারী, ভক্তগোষ্ঠী, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী সংখ্যা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব এসব বিষয় অনেক ক্ষেত্রে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ফলে ধর্মের পরিবর্তে ব্যক্তি সামনে চলে আসছে।
ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি রহ. সতর্ক করেছিলেন, যখন দ্বীনি জ্ঞান আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে দুনিয়াবি সম্মান, নেতৃত্ব ও সম্পদ অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন তা সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনায় পরিণত হয়। তাঁর ভাষায়, ইলমের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো ইলমকে দুনিয়া অর্জনের সিঁড়ি বানানো।
আজ ওয়াজ-মাহফিলের অর্থনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিপুল সম্মানী, শর্তসাপেক্ষ অংশগ্রহণ, প্রচারণাভিত্তিক আয়োজন এবং তারকাকেন্দ্রিক মাহফিল সংস্কৃতি অনেকের মনে এই ধারণা তৈরি করেছে যে ধর্মীয় মঞ্চ ধীরে ধীরে এক ধরনের শিল্পে পরিণত হচ্ছে। ইসলাম অবশ্য আলেমের জীবিকা অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু ধর্মকে ব্যবসার উপকরণে পরিণত করার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছে।আল্লাহ তাআলা বলেন,'তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না।'(সূরা আল-বাকারা ৪১)
মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ আল্লাহর দ্বীনকে পার্থিব স্বার্থের কাছে বিকিয়ে না দেওয়া।ধর্মীয় অঙ্গনের আরেকটি সংকট হলো যোগ্যতার অবক্ষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে গভীর জ্ঞান ছাড়াই কেউ রাতারাতি জনপ্রিয় বক্তায় পরিণত হতে পারেন। ফলে বহু ক্ষেত্রে কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও ইসলামী ঐতিহ্যের পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া লোকেরা লাখো মানুষের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন। ভুল তথ্য, দুর্বল বর্ণনা, জাল হাদিস এবং ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা বাড়ছে।
ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহ. বলতেন, 'যে ব্যক্তি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়, সে মূলত নিজের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে।'অথচ বর্তমান সময়ে অনেকেই এমনভাবে কথা বলেন যেন ইসলামের সব বিষয়ে তাদের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। এই প্রবণতা জ্ঞানচর্চার জন্য বিপজ্জনক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, কিছু ক্ষেত্রে মাহফিলের মঞ্চ মুসলিম সমাজের ঐক্যের পরিবর্তে বিভক্তির কারণ হয়ে উঠছে। এক আলেম আরেক আলেমকে আক্রমণ করছেন, এক দল আরেক দলকে বিদ্রূপ করছে, মতভেদ রূপ নিচ্ছে শত্রুতায়। অথচ কুরআন মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করেছে,
'তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।'(সূরা আল-আনফাল ৪৬)
ইসলামের ইতিহাসে মতভেদ ছিল, কিন্তু তা ছিল জ্ঞানভিত্তিক। আজকের মতো ব্যক্তিগত অপমান, সামাজিক চরিত্রহনন এবং জনসম্মুখে কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল না।
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে। তারা আলেমদের সম্মান করে, মাহফিলে যায়, ধর্মীয় আলোচনা শোনে। এই আবেগ ও ভালোবাসা একটি অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সেই আবেগকে যদি ব্যক্তিগত প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ বা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার উপকরণ বানানো হয়, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা।
ইসলামকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু ইসলামবিদ্বেষীদের মোকাবিলা করা নয়, ইসলামের নামে ঘটে যাওয়া বিকৃতি, অতিরঞ্জন, অজ্ঞতা এবং আত্মস্বার্থকেও চিহ্নিত করা। নববী দাওয়াত ছিল বিনয়, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও চরিত্রের দাওয়াত। সেই দাওয়াতকে মাইক্রোফোনের উচ্চতা, ইউটিউবের ভিউ কিংবা ভাইরাল ক্লিপের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেললে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য আড়াল হয়ে যায়।
বর্তমান বাংলাদেশ প্রয়োজন বেশি আলেম নয়, প্রয়োজন বেশি দায়বদ্ধ আলেম। প্রয়োজন বেশি বক্তা নয়, প্রয়োজন বেশি সৎ ও প্রজ্ঞাবান দায়ী। প্রয়োজন বেশি মাহফিল নয়, প্রয়োজন বেশি নববী আদর্শ চর্চা। কারণ ইসলাম কখনো শব্দের শক্তিতে বিজয়ী হয়নি, বিজয়ী হয়েছে সত্য, জ্ঞান, আমল ও চরিত্রের শক্তিতে।
(লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর)
সম্পাদক ও প্রকাশক: এস আর নিরব। Office: ২০৫/৪, খান প্লাজা, (লিফটে ৭ রুম নং -৯ সি) ফকিরাপুল, কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা ১০০০, Mobil: 01713-086019
ই-পেপার