প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ৩:৫৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ
তীব্র শব্দদূষণে অতিষ্ঠ তাড়াইলবাসী, প্রশাসনের পদক্ষেপ জরুরি

আল-মামুন খান, স্টাফ রিপোর্টার:
অটো-সিএনজির হাইড্রোলিক হর্ন, মাইকিং, ওয়ার্কশপের বিকট শব্দ আর যানবাহনের অযথা হর্ন—সব মিলিয়ে তীব্র শব্দদূষণে অতিষ্ঠ কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার মানুষ। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, থানা কিংবা আবাসিক এলাকা—কোথাও যেন থামছে না শব্দের দাপট। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ চোখে না পড়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।তাড়াইল উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক ও বাজার এলাকায় চলাচলকারী অটো-সিএনজি, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহারের পাশাপাশি গাড়ির সামনে-পেছনে মাইক বেঁধে উচ্চ শব্দে চলছে পণ্য ও সেবা বিক্রির প্রচার। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বার, বৈদ্যুতিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রচারে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাইকের উচ্চ শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা।স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তায় চলাচলের সময় যানবাহনের বিকট হর্নের কারণে অনেক সময় কানে হাত দিয়ে চলতে হয়। এমনকি পাশে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি জোরে কথা বলতে হয়। বাজার এলাকায় শব্দের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে স্বাভাবিক পরিবেশে কথোপকথনও কঠিন হয়ে পড়ে।
নীরব এলাকায়ও নেই নীরবতা
স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও থানা এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তাড়াইলে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও নিয়মিত উচ্চ শব্দে হর্ন ও মাইকিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন হাসপাতালের রোগী ও চিকিৎসক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লি এবং আশপাশের বাসাবাড়ির বাসিন্দারা।তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে যানজটের মধ্যে অহেতুক হর্ন বাজানোর ঘটনাও নিত্যদিনের। রোগী ও স্বজনদের জন্য যেখানে শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন, সেখানেই যানবাহনের বিকট হর্নে তৈরি হচ্ছে অসহনীয় পরিস্থিতি।
আবাসিক এলাকাতেও ওয়ার্কশপের বিকট শব্দ
শুধু সড়ক বা বাজার নয়, উপজেলার বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও শব্দদূষণের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে ছোট-বড় ওয়ার্কশপ ও কারখানা।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক ওয়ার্কশপে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেশিনের বিকট শব্দ চলে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। শিশু ও বয়স্কদের ঘুমেরও সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন শব্দের মধ্যে বসবাস করায় অনেকেই মানসিক অস্বস্তিতে ভুগছেন।‘সবাই হর্ন বাজায়, আমিও বাজাই’
শব্দদূষণের আইন সম্পর্কে অনেক চালকেরই ধারণা নেই—স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।গতকাল রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে যানজটের মধ্যে অকারণে হর্ন বাজাতে থাকা এক মাইক্রোবাস চালকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “হর্ন না বাজালে গাড়ি সরবে না।”তাকে অকারণে হর্ন বাজানো আইন লঙ্ঘন এবং এ জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে জানানো হলে তিনি এসব বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।একইভাবে তাড়াইল থানার সামনের সড়কে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো সাইফুল মিয়া বলেন, “সবাই তো হর্ন বাজাচ্ছে, তাই আমিও বাজাই। হর্ন না বাজালে দীর্ঘ সময়েও গাড়ি সরবে না।”চালকদের এমন বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট—শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।শব্দদূষণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিঃ
তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অতীশ দাস রাজিব বলেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে কমে গিয়ে একপর্যায়ে বধিরতাও হতে পারে।তিনি বলেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ও অসহনীয় শব্দ কানে প্রবেশ করলে স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পালস ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। এতে অস্বস্তি তৈরি হয়। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, খিটখিটে মেজাজ ও নিদ্রাহীনতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণ শুধু শ্রবণশক্তির ক্ষতি করে না, বরং মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিনিষেধ থাকার পরও তাড়াইলে এর বাস্তব প্রয়োগ কোথায়?অযথা হর্ন, হাইড্রোলিক হর্ন, অনুমোদনহীন উচ্চ শব্দে মাইকিং এবং আবাসিক এলাকায় শব্দদূষণ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান না থাকায় চালক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আইন অমান্যের প্রবণতা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।তাড়াইল সদর বাজার, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়গুলোতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ও হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা, অনুমোদনহীন মাইকিং নিয়ন্ত্রণ এবং আবাসিক এলাকায় শব্দদূষণকারী ওয়ার্কশপগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, শব্দদূষণকে ‘সাধারণ বিষয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারে।তাড়াইলবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করবে এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এস আর নিরব। Office: ২০৫/৪, খান প্লাজা, (লিফটে ৭ রুম নং -৯ সি) ফকিরাপুল, কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা ১০০০, Mobil: 01713-086019
ই-পেপার