প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২৮, ২০২৬, ৮:৪০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ২৮, ২০২৬, ৭:০৩ অপরাহ্ণ
চোরাচালানের করিডর যশোর-নড়াইল মহাসড়ক, আটক অভিযান অব্যাহত থাকলেও স্বর্ণ যাচ্ছে সীমান্তে

এস আর নিরবঃ যশোরঃ
সীমান্তবর্তী যশোরকে স্বর্ণ চোরাচালানের রুট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করে আসছে একটি চক্র। এবার সেই চোরাচালানের বড় একটি করিডর হয়ে উঠেছে যশোর-নড়াইল মহাসড়ক। বিশেষ করে মহাসড়কের নীলগঞ্জ ব্রিজ ও দাইতলা ব্রিজ এলাকায় একের পর এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তথ্য বলছে, ঢাকা থেকে স্বর্ণ নিয়ে যশোর হয়ে শার্শা, বেনাপোল, চৌগাছা ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিজিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের মে থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত যশোর-নড়াইল মহাসড়কের নীলগঞ্জ ও দাইতলা এলাকায় অন্তত ৯টি পৃথক চালান আটক করেছে বিজিবি। এসব অভিযানে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে মোট ৬০টি স্বর্ণের বার। যার ওজন প্রায় ৭ কেজি ১২২ গ্রাম। এসব স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ১৪ কোটি ২৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা।
নীলগঞ্জ ব্রিজ যেন ‘স্বর্ণের হটস্পট’ :
গত ৪ মাসে সবচেয়ে বেশি চালান ধরা পড়েছে যশোর শহরের (যশোর-নড়াইল মহাসড়কের) নীলগঞ্জ ব্রিজ এলাকায়। গত ৭ মে একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালিয়ে ৩ কেজি ৪৮ গ্রাম ওজনের ২৬টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে বিজিবি। এর বাজারমূল্য ছিল ৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৭ টাকা। ওই ঘটনায় যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামের ইসরাইল সর্দার, চৌগাছা উপজেলার উত্তর কয়েরপাড়া গ্রামের আব্দুল গনি ও শার্শা উপজেলার রাজনগর গ্রামের রনিকে আটক করা হয়।
এরপর ২ জুন একই নীলগঞ্জ ব্রিজ এলাকা থেকে ১ কেজি ৩৯৭ গ্রাম ওজনের ১২টি স্বর্ণের বারসহ ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকার বাসিন্দা লিটন রায় নামে একজনকে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ছিল ২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
জুলাইয়ে এসে নীলগঞ্জে একের পর এক চালান ধরা পড়ে। ৭ জুলাই ৫৮৩ দশমিক ১৯ গ্রাম ওজনের চারটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি অর্ধেক স্বর্ণের বারসহ নড়াইল জেলার টোনা গ্রামের রিপন মৃধা নামে একজনকে আটক করা হয়। এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ১৩ জুলাই একই এলাকায় আবার অভিযান চালিয়ে ১১৬ দশমিক ৬২ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এর স্বর্ণমূল্য ছিল ২৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮৯ টাকা। বিজিবির জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বাসন্ডা গ্রামের তাজুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে যশোর হয়ে নাভারণ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে তিনি স্বর্ণটি বহন করছিলেন।
২২ জুলাই নীলগঞ্জ ব্রিজে ফের ধরা পড়ে আরেকটি চালান। এবার ২২০ দশমিক ৪৯ গ্রাম ওজনের দুটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে বিজিবি। স্বর্ণের মূল্য ছিল ৪৬ লাখ ২৮ হাজার ৮৫ টাকা। আটক সাদিকুর রহমান সুমন’ন দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণগুলো ঢাকা থেকে যশোর হয়ে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে নেওয়ার কথা ছিল।
২৬ জুলাই একই এলাকায় যেন আরও বড় ধাক্কা দেয় বিজিবি। সেদিন ৬৮০ গ্রাম ওজনের চারটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি অর্ধেক স্বর্ণের বারসহ নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার ইসলামিয়া বাজার গ্রামের সুমন মণ্ডল নামে একজনকে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৩৩ হাজার ১৭৫ টাকা।
ফলে মাত্র জুলাই মাসেই নীলগঞ্জ ব্রিজ এলাকা থেকে কয়েক দফা অভিযানে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে এ কারণে এলাকাটি রীতিমতো ‘স্বর্ণের হটস্পট’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
দাইতলা ব্রিজেও একই চিত্র :
শুধু নীলগঞ্জ নয়, যশোর-নড়াইল মহাসড়কের যশোর শহরতলীর দাইতলা ব্রিজ এলাকাও স্বর্ণ বহনের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। গত ৯ জুলাই সেখানে ৫৩৫ গ্রাম ওজনের চারটি পূর্ণাঙ্গ ও একটি অর্ধেক স্বর্ণের বারসহ তৌফিকুর রহমান নামে একজনকে আটক করে বিজিবি। এসব স্বর্ণের মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।
১৮ আগস্ট দাইতলা ব্রিজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৫০ গ্রাম ওজনের দুটি স্বর্ণের বারসহ ওসমান গনি নামে একজনকে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের বাজারমূল্য ৭৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঢাকা থেকে স্বর্ণ নিয়ে যশোর হয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা জানান।
সর্বশেষ ২৫ আগস্ট দুপুরে দাইতলা ব্রিজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৪ লাখ টাকা মূল্যের ১৯২ দশমিক ৪৫ গ্রাম ওজনের দুটি স্বর্ণের বারসহ মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের ময়ুর (৪২) নামে একজনকে আটক করে বিজিবি। বিজিবি জানিয়েছে, তার শরীরে বিশেষভাবে লুকানো অবস্থায় স্বর্ণের বার দুটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন ও নগদ ১ হাজার ৬০০ টাকা জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ময়ুর বিজিবিকে জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে স্বর্ণের বার দুটি নিয়ে যশোর হয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন তিনি।
আটকরা বহনকারী, অধরা মালিক :
বিভিন্ন সময় অভিযানে স্বর্ণের বাহকরা আটক হলেও তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে স্বর্ণ চোরাচালানের মূলহোতা ও মালিকরা। সূত্রের দাবি, মূলহোতারা আড়ালে থেকে অর্থ দিয়ে দ্বিতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাহকদের কাজে লাগায়। বিজিবির ভাষ্য, বাহকদের সঙ্গে মূলহোতাদের সরাসরি দেখা বা কথা না হওয়ায় তারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও মূলহোতাদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিজিবির বক্তব্য :
যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মাহমুদ সাইফুল আলম খান বলেন, যশোর-নড়াইল মহাসড়ক স্বর্ণ চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। স্বর্ণের চালান ঢাকার দিক থেকে এসে যশোর হয়ে সীমান্তের দিকে যাচ্ছে।
কখনো গন্তব্য শার্শা-বেনাপোল, কখনো চৌগাছা, আবার কখনো সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা। অর্থাৎ রাজধানী থেকে সীমান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ এই রুটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যশোর-নড়াইল মহাসড়ক ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।
নীলগঞ্জ এলাকায় ৪৯ বিজিবির সদর দপ্তর ও নজরদারি ব্যবস্থা থাকার পরও চোরাকারবারিরা কৌশলে এ পথ ব্যবহার করছে। কখনো প্যান্টের পকেটে, কখনো শরীরের বিশেষ স্থানে, আবার কখনো প্রাইভেটকারে লুকিয়ে স্বর্ণ বহন করা হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এস আর নিরব। Office: ২০৫/৪, খান প্লাজা, (লিফটে ৭ রুম নং -৯ সি) ফকিরাপুল, কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা ১০০০, Mobil: 01713-086019
ই-পেপার