দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা খুলনার কয়রা উপজেলায় সরকারি খালগুলোতে অবৈধ নেট-পাটা ও আটন জাল বসিয়ে মাছের পোনা আহরণের অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়ছে কৃষিজমি। ফলে আমন ধান চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকা কয়রার মানুষের জীবন-জীবিকা মূলত কৃষি ও সুন্দরবননির্ভর। চলতি মৌসুমে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশন নিয়ে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষক ও সাধারণ মানুষ।স্থানীয়দের দাবি, কয়রা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ বৃষ্টির পানি শাকবাড়িয়া খাল, কয়রা খাল ও কাশীখালসহ বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু এসব সরকারি খালের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে নেট-পাটা, আটন ও জাল বসিয়ে মাছ ধরার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি খাল ঘুরে দেখা যায়, খালের একাধিক স্থানে নেট-পাটা ও আটন জাল বসানো রয়েছে। এসব জালে চিংড়ি, পুঁটি, শোল, কৈসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা আটকে পড়ছে। পরে সেগুলো স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে মাছ ধরার এই প্রবণতা শুধু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকার প্রতিবছর দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে মাছের পোনা বিতরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও খাল ও জলাশয়ে অবাধে মাছের পোনা আহরণ বন্ধ না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।কয়রা সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর কয়রা গ্রামের কৃষক আজগর আলী বলেন, “আমাদের এলাকায় স্লুইসগেট না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয় না। কয়েকটি কালভার্ট ও পাইপের মাধ্যমে পানি বের হলেও খালগুলোতে নেট-পাটা ও আটন জাল বসিয়ে রাখায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে।”মহারাজপুর ইউনিয়নের পূর্ব মঠবাড়ি গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যায় ভুগছি। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। সময়মতো পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং এডিস মশার প্রজননও বাড়ে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।”তিনি আরও বলেন, “অন্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় আমন ধানের বীজতলা সময়মতো তৈরি করতে পারিনি। শেষ সময়ে এসে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও নির্ধারিত সময়ে ধান রোপণ করতে পারব কি না, তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।”রবিউল ইসলাম জানান, তাদের এলাকার পানি শাকবাড়িয়া খালসহ কয়েকটি শাখা-প্রশাখা দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ কয়েকটি কালভার্টও বর্তমানে পানি নিষ্কাশনের জন্য অনেকটাই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।সরকারি খাল দখলমুক্ত ও অবমুক্ত করে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করার উদ্যোগ দেশব্যাপী নেওয়া হয়েছে। অবৈধ দখল ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে।তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়রা উপজেলার সরকারি খালগুলোতে অবৈধ নেট-পাটা ও আটন জাল স্থাপনের বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিয়মিত অভিযান চোখে পড়ছে না। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে কৃষক ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দ্রুত সরকারি খালগুলো থেকে অবৈধ নেট-পাটা ও আটন জাল অপসারণ, জরাজীর্ণ কালভার্ট সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় স্থানে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে। এতে কৃষিজমি জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি আমন চাষও নির্বিঘ্ন হবে।বিষয়টি নিয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কয়রা উপজেলার সকল সরকারি খাল অবমুক্ত করা হবে। পাশাপাশি অবৈধ নেট-পাটা ও আটন জাল উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে এবং সরকারি খালগুলো অবৈধ দখল ও প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।