বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় সোহাগী খাতুন (২৬) নামে দুই সন্তানের জননীর রহস্যজনক মৃত্যুর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। একই সঙ্গে ঘটনার সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দুই কন্যা সন্তানও নিখোঁজ থাকায় এলাকাজুড়ে চরম উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। মেয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও নিখোঁজ নাতনিদের উদ্ধারের দাবিতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও কোনো আশার আলো না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নিহতের অসহায় মা সাহেরা খাতুন।
শনিবার (১৩ জুন ২০২৬) দুপুরে উপজেলার নেপালতলী ইউনিয়নের কালুডাঙ্গা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই গ্রামের রবিউল মণ্ডলের ছেলে রাজু মণ্ডল (৪০)-এর সঙ্গে প্রায় ১৩ বছর আগে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে হয় মৃত শাজাহান শেখের বড় মেয়ে সোহাগী খাতুনের। দাম্পত্য জীবনে তাদের সংসারে জন্ম নেয় দুই কন্যা সন্তান – রাফিয়া আক্তার (৯) ও রাখি খাতুন (৭)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে জীবিকার তাগিদে রাজু মণ্ডল বিদেশে পাড়ি জমান। স্বামী প্রবাসে থাকাকালে সোহাগীকে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের। তবে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দীর্ঘদিন তিনি নীরবে সবকিছু সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।
নিহতের মা সাহেরা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, গত ৪ জুন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে যেকোনো সময় পরিকল্পিতভাবে তার মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা হয়। তার দাবি, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
ঘটনার খবর পেয়ে গাবতলী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
তবে পুরো ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নিহত সোহাগীর দুই কন্যা সন্তান ঘটনার সময় বাড়িতে উপস্থিত ছিল বলে পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা। ফলে তারা ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই শিশু দুটির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এতে পরিবার, স্বজন এবং এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাহেরা খাতুন বলেন, “আমার মেয়েকে হারিয়েছি, এখন আমার দুই নাতনিরও কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। আমি আশঙ্কা করছি, তাদের কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আমার বিশ্বাস, তারা ঘটনার সত্যতা জানে বলেই হয়তো তাদের আড়াল করা হয়েছে। আমি একজন অসহায় দরিদ্র মা। প্রশাসনের কাছে আমার আকুল আবেদন, আমার মেয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক এবং আমার দুই নাতনিকে দ্রুত উদ্ধার করা হোক।”
এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল সোহাগী খাতুনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিখোঁজ দুই শিশুকে দ্রুত উদ্ধার করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে গাবতলী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রকিব হোসেন বলেন, “সোহাগী খাতুনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিতভাবে বলা যাবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। পাশাপাশি তার দুই কন্যা সন্তানকে উদ্ধার করে নানীর জিম্মায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”
ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং নিখোঁজ দুই শিশুর নিরাপদ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এলাকাবাসীর উদ্বেগ কাটছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তই পারে এ ঘটনায় জনমনে সৃষ্ট নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে।